সাহিত্য রচনা ও পাঠ মানুষের জীবন জীবিকার বাইরে সংস্কৃতির পথে যাত্রার অনেক ধাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ l যখন লিপি আবিষ্কার হয় নি, মুদ্রণযন্ত্র ছিলো না, সাহিত্য রচনার প্রয়াস তারও আগের l রচিত সাহিত্য মুখে মুখে বাহিত হয়েছে শতাব্দীর পর শতাব্দী, দেশ থেকে দেশান্তরে l যুগ বদলে, মুখ বদলে, দেশ বদলে বাহিত সাহিত্য পরিবর্তিত হতে হতে, বিবর্তিত হতে হতে একটি পর্বে পুঁথি আকারে লিখিত ও সংরক্ষিত হলো l তারপরে এলো মুদ্রণযন্ত্র l অল্প সময়ে, স্বল্প ব্যয়ে পুরোনো ও নতুন সাহিত্য বহু বহু সংখ্যায় রচিত হতে লাগলো l বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কল্যানে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হলো l পৃথিবীর এক প্রান্তে রচিত ও মুদ্রিত সাহিত্য অন্য প্রান্তে পৌঁছে যেতে লাগলো l এর ফলে এক দেশের ও ভাষার সাহিত্যে যে আন্দোলন হলো তার ঢেউ গিয়ে পড়লো অন্য দেশের অন্য ভাষার সাহিত্যে l শিল্প  সংস্কৃতির একটি ক্ষেত্রে যে আন্দোলন বিবর্তন হলো তা সংস্কৃতির অন্য ক্ষেত্রকেউ আন্দোলিত করলো l ইউরোপীয় সাহিত্যের জগতে যে আন্দোলনগুলি সংগঠিত হয়েছিল তা পৃথিবীর অন্য দেশের সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় উপমহাদেশের সাহিত্যকেউ প্রভাবিত করলো l চিত্রজগতের আন্দোলন সাহিত্যজগতে সঞ্চারিত হলো l


যুগে যুগে দেশে দেশে কালজয়ী সাহিত্য রচিত হয়ে চলেছে l তারপরেও সাহিত্য রচনার বিরাম নেই l অন্য নানা ক্ষেত্রে বিশেষত বিনোদনের জগতে যুগান্তকারী সব আবিষ্কার হয়ে গেছে l সেই সব অনায়াস বিনোদনের ভিড়ে শ্রমসাধ্য সাহিত্য রচনা ও পাঠ আজকের দিনেও প্রাসঙ্গিক কি না এ প্রশ্ন এসেছে l


কথা হলো,  সব যুগেই সাহিত্য প্রাসঙ্গিক থেকেছে l তার সঙ্গে এটাও সত্য যে যুগের নিরিখে সাহিত্য প্রতি মুহূর্তে আধুনিক হয়েছে l মানুষ সজীব, চলিষ্ণু । তার জীবন, ধ্যান, ধারণা, আদর্শ অচল অটল নয় । যুগে যুগে তার পরিবর্তন হয়েছে । সেই পরিবর্তন সাহিত্য ও শিল্পে প্রতিফলিত হয়েছে । এই প্রতিফলন সাহিত্যকে সব যুগে প্রাসঙ্গিক রেখেছে l


অতীত দিনে জীবন কেমন ছিলো ? বর্তমান জীবন কেমন হয়েছে ? এই উভয় জীবন সাহিত্যে তার নিজের মতো করে ধরা আছে l কারণ সাহিত্য হলো জীবনের দর্পন এবং মানুষের জীবন হচ্ছে সাহিত্যের উপকরন l  রামায়ন মহাভারত বা আরব্য উপন্যাসের যুগে মানুষের জীবন আর শেক্সপিয়ার এর যুগে মানুষের জীবন এক নয় । শেক্সপিয়ার এর যুগের জীবন আর রবীন্দ্র নজরুলের যুগের জীবনে আকাশ পাতাল পার্থক্য । কিন্তু এই প্রত্যেক জীবনের ছবি এবং সেই সময় সেযুগের সাহিত্যের উপকরণ হয়েছে । প্রতিটি নতুন যুগ সেই যুগের সাপেক্ষে আধুনিক এবং  প্রতিটি যুগেই সাহিত্যকে তার নিজের মতো করে প্রাসঙ্গিক থাকতে হয়েছে ।


প্রাচীন যুগে সাহিত্যের প্রধাণ বিষয়বস্তু ছিলো নরনারীর প্রণয়, তার সংঘাত ও প্রতিক্রিয়া । সীতাহরণ । রামরাবণের যুদ্ধ । রামায়ন । দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ । কৌরবপান্ডবের যুদ্ধ । মহাভারত । হেলেন হরণ । এথেন্স স্পার্টার যুদ্ধ । ইলিয়াড ।  অবসর প্রধাণ জীবনে এটাই ছিলো বড়ো ঘটনা এবং সেই সময় সাহিত্য ছিলো অবসরভোগী সমাজের অবসর বিনোদনের বস্তু ।


আজ জীবনে এতো অবসর নেই । বৈজ্ঞানিক নানা আবিষ্কারে জীবন দ্রুততর হয়েছে, গনতান্ত্রিক চিন্তাচেতনার বিকাশ হয়েছে । এখন শ্রমিক অর্থাৎ মেহনতি জনতা দেশের সামাজিক জীবনের প্রাণ হয়ে দাঁড়িয়েছে । তাঁদের জীবনের বিচিত্র ঘটনা ও সমস্যা আজ সাহিত্যের বিষয়বস্তু হয়েছে । তাই প্রণয়ের সাথে সাথে মানুষের জীবনসংগ্রামের দলিল হয়ে উঠছে আজকের সাহিত্য ।


সাহিত্যের নানা ধারায় আমরা দেখবো সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সাহিত্য কিভাবে নিজেকে পরিবর্তন করে নেয় এবং এভাবেই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে । উপন্যাস সাহিত্যে আমরা দেখি বঙ্কিমের যুগে মনোমুগ্ধকর কাহিনী পরিবেশন রীতি ছিলো । এই ধারা থেকে কিছুটা সরে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন  "চোখের বালি" 'চতুরঙ্গ' উপন্যাস । লিখনশৈলীর নতুনত্ব এলো "শেষের কবিতা" উপন্যাসে । গল্পের প্রাধান্য সত্বেও শরৎচন্দ্রে পেলাম সামাজিক নানা সমস্যার চিত্রায়ন, বিশেষ করে গ্রামীন সমস্যা ও সমাজে নারীর অবস্থান । এলেন বাংলাসাহিত্যে খ্যাতনামা তিন বন্দ্যোপাধ্যায় - তারাশংকর, বিভূতি ও মানিক । তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন খন্ড সময়ের কথাকার । তাঁর আখ্যানে খন্ড সময়ের মানুষ সুখ, দুঃখ; হিংসা, দ্বেষ; প্রেম, ভালোবাসা নিয়ে উপস্থিত হয়েছে আদিম জৈবিকতায় । এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঔপন্যাসিকের রাজনৈতিক বোধ ও জীবনবীক্ষা । বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় দৈনন্দিন জীবনের তুচ্ছ ঘটনাকে বেঁধে দেন মহাকালের গতিতে । তার সঙ্গে যুক্ত হয় প্রকৃতিহৃদ্যতা ও আধ্যাত্মিক বোধ । মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন সচেতন শিল্পী। তাঁর অভিজ্ঞতা দর্শন ও সিদ্ধান্ত পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতেই তিনি কলম ধরেন ।


কবিতার ক্ষেত্রেও দেখি কাহিনীপ্রধাণ কবিতা থেকে যুগের বিবর্তনে কবিতা কিভাবে খন্ড দৃশ্যের বর্ননা, চিত্রপ্রধান এবং সবশেষে বিমূর্ততায় এসে ঠেকেছে ।


এইভাবে যুগে যুগে সাহিত্য পাল্টে গেছে এবং সাহিত্যচর্চা যুগের প্রেক্ষিতে প্রাসঙ্গিক থেকেছে ।