সম্পর্ক এক অদ্ভুত জিনিস l নানা কাকতালীয় ঐতিহাসিক, সামাজিক ও ভৌগোলিক কারণে মানুষে মানুষে, সমাজে সমাজে, দেশে দেশে সম্পর্ক গড়ে ওঠে l এই সম্পর্ক বন্ধুতার ও শত্রুতার l গভীর বন্ধুত্বের সম্পর্ক কখন যে শত্রুতায় পর্যবসিত হয় সম্পর্কিত ব্যক্তিরাও অনেক সময় তা বুঝে উঠতে পারেন না l নানা পারিপার্শ্বিক পরিবেশ, পরিস্থিতি এই সম্পর্ককে চালিত করে যেটা অনেক সময় সেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে না l দেখা যায় আবেগতাড়িত হয়ে তারা এই সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন, বন্ধুত্ব আরো গভীর হয়, শত্রুতার সম্পর্ক আরও তিক্ততায় ভরে যায় l সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি মজার রসায়ন হল যখন দুটি মানুষের মধ্যে সম্পর্কে গভীর বন্ধুত্ব থাকে তখন তারা পরস্পরের সম্বন্ধে যে উক্তিগুলি করেন অনেক ক্ষেত্রেই তা অতিশয়োক্তি হয়ে থাকে l মাত্রাছাড়া প্রশংসা করেন l কোনো কারণে যদি সেই সম্পর্কের অবনতি হয়, তখন সেই একই মানুষ সেই একই মানুষ সম্বন্ধে এমন উক্তিগুলো করেন যেগুলো পূর্বে করা উক্তিগুলো থেকে ১৮০° বিপরীত হয়ে থাকে l এটা উভয় পক্ষেই হতে পারে l আবার অনেকসময় দেখা যায়, যে দুটি মানুষের মধ্যে সম্পর্কের তিক্ততা এল, তাদের মধ্যে একজন প্রকাশ্যে যে পরিমাণ বিরূপ উক্তি করছেন অন্যজন হয়তো সে পরিমাণ করছেন না, বা তিনি হয়ত এই প্রশ্নে নীরব থাকছেন l হয়তো পূর্বের মতো প্রশংসা করছেন না, কিন্তু নিন্দাবাক্যও ব্যবহার করছেন না l
মানুষ আবেগপ্রবণ l আবেগ দ্বারা চালিত l তাই তার সমস্ত আচরণ সবসময় যুক্তি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত করা যায় না l কিন্তু দীর্ঘকালীন ভিত্তিতে মানুষের আচরণ থেকেই  মানুষ সম্বন্ধে, তার স্বভাবচরিত্র সম্বন্ধে, তার আচরণপ্রকৃতি সম্বন্ধে একটা সাধারণ ধারণা করা যায় l সেই সাধারণ ধারণার ভিত্তিতে উপরের কথাগুলি লেখা l সকলের ক্ষেত্রে সর্বদা এটা নাও মিলতে পারে l বরং বলা যায়, ব্যক্তিভেদে আলাদা হওয়াটাই স্বাভাবিক l
আমরা আলোচনা করব বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট দুজন কবি সম্বন্ধে l তাঁরা হলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায় l
তাঁরা সমসাময়িক ছিলেন এবং তাদের সম্পর্কের মধ্যেও অনেক ওঠাপড়া ছিল l একসময় তাঁদের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল l পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ভালবাসা পোষণ করতেন l এই সময়ে তাঁরা পরস্পরের সম্বন্ধে অনেক প্রশংসাব্যঞ্জক উক্তি করেছেন l পরবর্তীতে যখন এই সম্পর্কের অবনতি হল, তখন আমরা দেখলাম পরস্পর সম্বন্ধে করা সেই প্রশংসাব্যঞ্জক উক্তিগুলো কিভাবে পাল্টে পাল্টে যেতে লাগল l যদিও এটা দেখা গেছে যে সম্পর্কের যখন অবনতি হলো, কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রবীন্দ্রনাথ সমন্ধে যে হারে কটুক্তি করে গেছেন, তুলনায় রবীন্দ্রনাথ কিন্তু নীরব থেকেছেন l বরং এই পর্বে দেখা গেছে রবীন্দ্রনাথ দ্বিজেন্দ্রলালের প্রশংসাও করেছেন এবং তাঁকে পছন্দ করেছেন এমন নজিরও পাওয়া গেছে l কিন্তু দ্বিজেন্দ্রলালের দিক থেকে নমনীয় ভাব কখনো লক্ষ্য করা যায়নি l জীবনের অন্তিম পর্বে দ্বিজেন্দ্রলাল তাঁর ভুল বুঝতে পেরেছিলেন বলে শোনা যায় l তিনি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক পুনস্থাপন করতে চেয়েছিলেন এমনও শোনা যায় l তবে শেষ পর্যন্ত তাঁর জীবিতকালে তিনি সেটা করে উঠতে পারেননি l


আমরা দেখব এই দুজন মহান ব্যক্তির মধ্যে যখন সুসম্পর্ক ছিল তখন তাঁরা পরস্পর সম্বন্ধে কি উক্তি করছেন l


প্রথম জীবনে ঠাকুরবাড়ির অনেকের সঙ্গেই দ্বিজেন্দ্রলালের বেশ ঘনিষ্ঠতা ছিল। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গেও ছিল l দ্বিজেন্দ্রলাল কিছুদিন আবগারি বিভাগে পরিদর্শকের কাজ করেছেন। সেই সূত্রে তাঁর একটি বজরা ছিল। রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহের সেই বজরায় গিয়ে অনেক সময় কাটিয়েছেন l দ্বিজেন্দ্রলালের অন্য বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়েছেন l দু’জনেই পর পর গান গেয়েছেন।
রবীন্দ্রনাথ নিজে দ্বিজেন্দ্রলালের একাধিক গ্রন্থের সমালোচনা করেছেন। তার মধ্যে ‘মন্দ্র’ নামে কাব্যগ্রন্থটির ভূয়সি প্রশংসা করেছেন। ১৯০২ সালে প্রকাশিত এই কাব্যগ্রন্থ প্রসঙ্গে বঙ্গদর্শনে রবীন্দ্রনাথ লেখেন, ‘ দ্বিজেন্দ্রলালবাবু বাংলাভাষায় একটা নূতন শক্তি আবিষ্কার করিয়াছেন… তাহা ইহার গতিশক্তি।’ সেইসঙ্গে তিনি এ-ও যোগ করেছেন, ‘প্রতিভাসম্পন্ন লেখকের সেই কাজ। ভাষাবিশেষের মধ্যে যে কতটা ক্ষমতা রয়েছে তাহা তাঁহারাই দেখাইয়া দেন।’
রবীন্দ্রনাথ আরো লেখেন '..ইহার কবিতাগুলির মধ্যে পৌরুষ আছে। ইহার হাস্য, বিষাদ, বিদ্রূপ, বিস্ময় সমস্তই পুরুষের-তাহাতে চেষ্টাহীন সৌন্দর্যের সঙ্গে একটা স্বাভাবিক সরলতা আছে।’
‘আষাঢ়ে’র (প্রথম প্রকাশ : ডিসেম্বর, ১৮৯৯) সমালোচনায় রবীন্দ্রনাথ ‘ছন্দ এবং মিলের ওপর গ্রন্থকারের… আশ্চর্য দখলে’র কথা অকপটে স্বীকার করে বলেছিলেন, ‘তিনি বাঙালিকে কেবল হাসাইবার জন্য আসেন নাই, সেইসঙ্গে তাহাদিগকে ভাবাইবেন এবং মাতাইবেন।’ দ্বিজেন্দ্রলালের কবিতা তিনি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন।


দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ও আবার রবীন্দ্রনাথের গোরা উপন্যাসটির (প্রথম প্রকাশ ১৯১০) একটি ‘সহৃদয় সমালোচনা’ লিখেছিলেন, যা প্রকাশিত হয়েছিল অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ-সম্পাদিত বাণী পত্রিকায় (আশ্বিন-কার্তিক সংখ্যা ১৩১৭)। সেখানে দ্বিজেন্দ্রলাল এ-উপন্যাস সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘বস্ত্তত এত সুন্দর সামাজিক উপন্যাস কদাচিৎ নয়নগোচর হয়।… জ্ঞান ও প্রেম, যুক্তি ও অনুভূতি, সহিষ্ণুতা ও বিদ্রোহ এ অপূর্ব উপন্যাসের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় জ্বলিয়া উঠিতেছে। আর অপরদিকে স্বার্থসেবা, ক্ষুদ্রতা, হিংসা ও নিষ্ঠুরতা… তাহাদের আরও সমুজ্জ্বল করিয়া তুলিয়াছে।’ উপসংহারে দ্বিজেন্দ্রলাল তাঁর সিদ্ধান্ত টেনেছেন এই বলে যে : ‘এ উপন্যাস বাঙ্গলা সাহিত্যের গৌরব। সকলেরই… এই উপন্যাসখানি পাঠ করা উচিত l'
দুই খ্যাতিমান ব্যক্তিত্বের এই পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ প্রসঙ্গে সুধীর চক্রবর্তী লিখেছিলেন, ‘দুজনেরই ছিল উচ্চকুলজাত ।… কবিতা ও গান রচনা এবং নাট্যপ্রীতি তাঁদের পরস্পরকে কাছে টেনেছিল। দুজনেই বিলাত প্রবাস করেছেন এবং প্রায় একই ইংরাজি স্কচ ও আইরিশ গানে মজেছেন।’


আবার তাঁদের দুজনার মধ্যে পিছুটান বা জটিল বিভাজন-রেখাও ছিল l এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় (১৮৯২-১৯৯৫) যুক্তিযুক্তভাবেই বলেছিলেন : ‘রবীন্দ্রনাথ তাঁহার স্বভাবসিদ্ধ অন্তর্মুখী দৃষ্টি হইতে… অতুলনীয় ভাষার ইন্দ্রজালে অনির্বচনীয় ভাবের সৃষ্টি করিতেন।’ আর অন্যদিকে, ‘দ্বিজেন্দ্রলাল ছিলেন স্পষ্টবাদী, বাস্তবপন্থী; তাই তাঁহার প্রকাশধর্মে আবেগটাই প্রধান হইয়া উঠিত, রীতিটা নহে।… লালিত্য তাঁহার কাম্য ছিল না – স্পষ্ট কথা মোটা করিয়া বলিলে সকলেই বুঝিতে পারে – এখানেই ছিল তাঁহার গর্ব।’ সেই আত্মগর্বের গরজ থেকেই দ্বিজেন্দ্রলাল লিখেছিলেন, ‘যদি স্পষ্ট করিয়া লিখিতে না পারেন, সে আপনার অক্ষমতা। তাহাতে গর্বের কিছু নাই। অস্পষ্ট হইলেই গভীর হয় না; কারণ ডোবার জলও অস্পষ্ট, স্বচ্ছ হইলে… অগভীর হয় না; কারণ সমুদ্রের জলও স্বচ্ছ।… অস্পষ্টতা একটা দোষ, গুণ নহে।’ তাঁর কবিতায়, নাটকে, গানে এই গুণটি নানাভাবে বিচ্ছুরিত হয়ে উঠেছিল l
বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে রবীন্দ্রনাথ বলছেন, 'সাহিত্য সৃষ্টি, নির্মাণ নয় "সৃষ্টির উদ্দেশ্য পাওয়া যায় না, নির্মাণের উদ্দেশ্য পাওয়া যায়।.. ফুল কেন ফোটে তাহা কাহার সাধ্য অনুমান করে, কিন্তু ইঁটের পাঁজা কেন পোড়ে, সুরকির কল কেন চলে, তাহা সকলেই জানে। সাহিত্য সেইরূপ সৃজনধর্মী; দর্শন বিজ্ঞান প্রভৃতি নির্মাণধর্মী। সৃষ্টির ন্যায়, সাহিত্যই সাহিত্যের উদ্দেশ্য।"


বস্তুত এখান থেকেই দুই কবির মধ্যে শুরু হয় বিরোধ l দ্বিজেন্দ্রলাল শুরু করেন প্রকাশ্যে বিষোদ্গার। একাধিক প্রবন্ধে দ্বিজেন্দ্রলাল রবীন্দ্রনাথের কবিতার প্রতি যে দুটি অভিযোগ আনেন তা হল দুর্বোধ্যতা এবং অশ্লীলতা। দ্বিজেন্দ্রলালের মতে, রবীন্দ্রনাথের কবিতা অস্পষ্ট এবং অস্বচ্ছ। তাই তার মধ্যে চিন্তার গভীরতা নেই। আর তাঁর কবিতার নীতিহীনতা দিয়ে দ্বিজেন্দ্রলালের বক্তব্য তিনি সমাজকে কলুষিত করছেন । দুই কবির মধ্যে নীতিগত বিরুদ্ধ মত থাকতেই পারে। কিন্তু দ্বিজেন্দ্রলালের প্রতিবাদের ভাষা ছিল অত্যন্ত আক্রমণাত্মক। দ্বিজেন্দ্রলালের মতে ‘তুমি যেও না এখনই’ ‘কেন যামিনী না যেতে জাগালে না’ ইত্যাদি গান লম্পট বা অভিসারিকার গান। l সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর মাঝে মাঝে ছোট ভাইয়ের কবিতা আবৃত্তি করতেন, সেটা নাকি  ভাইয়ের কবিতার বিজ্ঞাপন। ঠাকুরবাড়িতে যে নাটকের অভিনয় হয়, সেগুলোও নাকি আত্মবিজ্ঞাপন ইত্যাদি। রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’ কবিতার দ্বিজেন্দ্র-কৃত সমালোচনা ছিলো অত্যন্ত নেতিবাচক। তিনি বলেন, এই কবিতা একেবারে অর্থশূন্য ও স্ববিরোধী l
রবীন্দ্রনাথ দ্বিজেন্দ্রলালের এই নেতিবাচক আক্রমণের প্রতিবাদ করতেন না l ফলে দ্বিজেন্দ্রলালের রাগ ক্রমশ বাড়তে থাকে, তিনি একটা কিছু চরম আঘাত হানতে চান l তিনি প্রাক্তন বন্ধুর বিরুদ্ধে কুৎসিত ইঙ্গিত দিয়ে একটি নাটিকা লিখে ফেললেন এবং স্টার থিয়েটারে তার অভিনয়েরও ব্যবস্থা হল।  সেটা ১৯১২ সালের নভেম্বর মাস l
‘আনন্দ বিদায়’-এর প্রথম রাত্রির অভিনয় বন্ধ করে দিতে হয় l সে নাটক আর দ্বিতীয় বার মঞ্চস্থ হয়নি। দ্বিজেন্দ্রলালের এই রুচিহীন কাজের জন্য তাঁর বেশ অপযশ হয়। দ্বিজেন্দ্রলালের জীবনীকারও এর জন্য তাঁর নিন্দে করেছেন। দ্বিজেন্দ্রলালের ছেলে দিলীপকুমার যাঁকে রবীন্দ্রনাথ খুবই স্নেহ করতেন, তিনিও বাবার এই কাজকে সমর্থন করেন নি।
রবীন্দ্রভক্তদের আক্রমণ করে ১৩১৩ বঙ্গাব্দের বঙ্গদর্শনে ‘কাব্যের উপভোগ’ প্রবন্ধে দ্বিজেন্দ্রলাল লেখেন, ‘ ...রবিবাবু যা’ই লেখেন তাতেই তাধিন-তাকি-ধিন-তাকি ম্যাও এঁও-ওঁও- বলে কোরাস দিতে পারি না,-রবীন্দ্রনাথবাবুর সঙ্গে বন্ধুত্বের খাতিরেও নয়।’


দ্বিজেন্দ্রলাল যিনি এক সময় রবীন্দ্রনাথকে বঙ্গের শ্রেষ্ঠ কবি বলে মেনে নিয়েছেন, তাঁরই ওপর বার বার কেন এমন আঘাত হেনেছেন, তা সত্যি বিস্ময়কর। এর কারণ কি শুধু ঈর্ষা? দু’জন সমসাময়িক লেখকের মধ্যে বন্ধুত্ব যেমন হয়, তেমনই ঈর্ষার সম্পর্কও স্থাপিত হতে পারে। সেটাও অস্বাভাবিক কিছু নয়। লেখকরা স্পর্শকাতর প্রাণী। যে কোনও শিল্পীই তাই। প্রায় একই বয়সী অন্য লেখকের সার্থকতা এবং খ্যাতি বেশি হয়ে যাচ্ছে দেখে আর এক জন লেখকের মন ঈর্ষায় জ্বলে উঠতে পারে, কিন্তু তিনি সেই জ্বালা মনে মনেই চেপে রাখেন। এমনকী সেই ঈর্ষার জ্বালায় তাঁর সৃষ্টি আরও বিকশিত হতে পারে। কিন্তু প্রকাশ্যে সেই ঈর্ষার নগ্নরূপ দেখানো কি কোনও লেখককে মানায় ?
কিন্তু এই সম্ভাবনা ক্ষীণ l রবীন্দ্রনাথকে ঈর্ষা করার কোনও কারণই নেই দ্বিজেন্দ্রলালের। তাঁর জীবদ্দশায় রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পাননি। দ্বিজেন্দ্রলাল মারা যান ১৯১২ সালে রবীন্দ্রনাথ নোবেল পান ১৯১৩ সালে l দ্বিজেন্দ্রলালের জীবিতকালে রবীন্দ্রনাথের সুনাম বাংলার বাইরে ছড়ায়নি। দু’জনেই কবি। দু’জনেই গান সৃষ্টি করেন। রবীন্দ্রনাথও নাটক লেখেন, কিন্তু নাট্যকার হিসাবে দ্বিজেন্দ্রলাল অনেক বেশি জনপ্রিয় ছিলেন। দু’জনেই অভিজাত পরিবারের সন্তান।
রবীন্দ্রনাথের দিক থেকে ঈর্ষা বা বিদ্বেষের সামান্যতম উপাদানও খুঁজে পাওয়ার উপায় নেই। সারা জীবনে রবীন্দ্রনাথ কখনও নিন্দুকদের সঙ্গে পাল্লা দিতে যাননি। কোনও আক্রমণেরই তিনি প্রতি আক্রমণ-অস্ত্র শানাননি। দ্বিজেন্দ্রলাল যখন থেকে রবীন্দ্র-বিদ্বেষী হয়ে ওঠেন, তখনও একাধিকবার রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রশংসা করেছেন। তাঁর লেখা পাঠ্যপুস্তক শান্তিনিকেতনে পড়াবার জন্য সুপারিশ করেছেন।


‘আনন্দ বিদায়’-এর পর দ্বিজেন্দ্রলাল সম্ভবত অনুতপ্ত হয়েছিলেন। তিনি খুব বিমর্ষ হয়ে থাকতেন। মৃত্যুর আগে তাঁরই জীবনীকারের কাছে তিনি ভুল স্বীকার করছেন। বলেছেন, ‘সত্যিই আমার অত্যন্ত ভুল হয়ে গেছে, আমি আর এমন কাজ করব না।’ আর রবীন্দ্রনাথ পিতার আচরণে অনুতপ্ত দিলীপকুমারকে স্নেহপাশে জড়িয়েছেন, মায়ার বাঁধনে বেঁধেছেন, চিঠিতে লিখেছেন, ‘তোমার পিতাকে আমি শেষ পর্যন্ত শ্রদ্ধা করেছি’।


দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের পুত্র দিলীপকুমার রায় তাঁর স্মৃতিচারণে লিখছেন,‘আজও মনে পড়ে আমার একটি অবিস্মরণীয় দিনের কথা। রবীন্দ্রনাথ সেদিন আমাদের সুকিয়া স্ট্রিটের বাসায় এসে “সে যে আমার জননী রে” গানটি গেয়ে সবাইকে মুগ্ধ করেন। গানের শেষে যখন পিতৃদেব তাঁকে আবীরে রাঙিয়ে দেন তখন কবিগুরু হেসে বলেছিলেনঃ “ আজ দ্বিজেন্দ্রবাবু শুধু আমাদের মনোরঞ্জন করেছেন তাই নয়- আমাদের সর্বাঙ্গ রঞ্জন করলেন”।’ এই রাঙিয়ে দেওয়ার সম্পর্ক পরবর্তীতে কি করে বিষিয়ে গেল তা সত্যি দুর্ভাগ্যজনক l


পরিশেষে একথাই বলব দুজন মানুষের মধ্যে সম্পর্ক সময় গড়ে দেয় l সময় আবার কখনও কখনও সেই সম্পর্ক ভেঙে দেয় l দুজন মানুষের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক সর্বদা অটুট থাকবে তার গ্যারান্টি কোনো পক্ষই দিতে পারে না l পরিবেশ, পরিস্থিতি, সময় এর কারণে যা কিছু হতে পারে l এক্ষেত্রে বলার এটাই যে যদি কোন বন্ধুত্বের সম্পর্ক ভেঙে যায় তাহলে উভয়ের সম্পর্কে পরস্পর প্রকাশ্যে কটূক্তি করা থেকে বিরত থাকা উচিত l যদি কারো সঙ্গে না পোষায় তাহলে তাকে উপেক্ষা করাটাই শ্রেয় l প্রকাশ্যে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তার সম্বন্ধে কটুক্তি করা নিষ্প্রয়োজন l যে ভুলটা রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে ক্রমাগত কটুক্তি করে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়  করেছিলেন এবং শেষ জীবনে সে ভুল তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁর জীবন থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়ার আছে l