ক্লান্ত, অবসন্ন, জীর্ণ-শীর্ণ শরীরের থুত্থুড়ে বুড়ি,
প্রায় জীবন্মৃত।
সারাদিন ভিক্ষে শেষে হা পিত্যেস করতে করতে
নোংরা, দূর্গন্ধময়, কোলাহলপূর্ণ রেল ষ্টেশনের প্লাটফর্মে ফেরে।
এটাই তার নীড়।

টাক খেয়ে চিরে যাওয়া দু’টি মালসা,
প্লাষ্টিকের বোতল কেটে বানানো একটি পানি খাবার পাত্র,
পাটকলের প্রায় সমবয়সী শতছিন্ন এক টুকরা চট,
পলিথিনের ব্যাগের মধ্যে টুকরো কাগজ আর ছেড়া-কাটা
পলিথিন ভরে, মুখে গিট মেরে বানানো তিনখানা বালিস।
সংসারের জিনিসপত্র বলতে এই-ই।
সব কিছুই কুড়িয়ে পাওয়া।
এখানেই সে ফিরে আসে প্রতিদিন।
এই ফিরে আসা আর না আসার পার্থক্য -
আমি বুঝি না।

সংসারের সদস্য সংখ্যা তিন।
একজন নিজে, অন্য দু’জন-
সে বারের মঙ্গায় অনাহারে মরা
বিল্লাল আর আম্বিয়ার অনাথ দুই শিশু।
তারা দু’জন মরেই বেঁচেছে,
এরা তিনজন বেঁচেও রয়েছে মরে।

ক্ষুদ্র দুই শিশু –
দু’জনে এক সাথে থাকে সব সময়।
এই বয়সে ওদের কি করার কথা ছিল
তার তালিকা অতি দীর্ঘ এবং সুধী সমাজের তা জ্ঞাত।
সুতরাং থাক সে সব।
বরং যা করে ওরা তাই বলি-
দু’জনের শরীরই উলঙ্গ থাকে সারাক্ষণ।
পরিধান বলতে কোমরে কালো সুতায়
বাঁধা গুল্টির মতো একটা তাবিজ।
কোরানের আয়াত লেখা এক টুকরা কাগজ সযত্নে ওর
মধ্যে পুরে মোম দিয়ে মুখ আঁটানো।
আল্লার কালাম সাথে থাকলে সুখ-সাচ্ছন্দ আসে,
এই বিশ্বাসে বুড়ী ওটা বেঁধে দিয়েছে কোমরে।
বাচ্চারা এর মানে বোঝেও না, বয়সও হয়নি বোঝার।

বুড়ী ভিক্ষে করতে চলে যায়,
ওরা পড়ে থাকে প্লাটফর্মে, অরক্ষিত।
চেয়ে-চিন্তে, কুড়িয়ে যা পায়-খায়,
আর ক্ষণ গোনে কখন বুড়ি ফিরবে।
বুড়ি যখন ফেরে তখন ঝিলিক দিয়ে ওঠে  দু’জনের চোখ-মুখ।
দৌড়ে গিয়ে আশ্রয় নেয় বুড়ির বুকের মধ্যে।
ঝোলা খুঁজে খুঁজে বের করে
চেয়ে-চিন্তে পাওয়া, খাবার অনুপযোগী আহার।
তৃপ্তি সহকারে খায়-
কি অনাবিল সুখ পায়,
আমি বুঝি না।

এক সন্তানহীনা দম্পতি ওদের একজনকে নিয়ে গিয়েছিল।
মধ্যবিত্ত পরিবারের সর্বোচ্চ যে সুবিধা একটা বাচ্চা পায়,
তার সবই তারা দিয়েছিল।
তারপরও সে চলে এসেছিল।
কেন, কিসের টানে-
আমি বুঝি না।

দম্পতিটি খুব ভাল ছিল,
পরবর্তী বারে তারা দু’জনকেই নিয়ে গিয়েছিল,
দিয়েছিল একই সুবিধা,
স্কুলে ভর্তি, স্কুল ড্রেস, খেলনা, আরো কত কি!
বুড়িও পই পই করে বলে দিয়েছিল থাকতে।
দুটোই আবার ফিরে এসেছে।
কেন, কিসের টানে-
আমি বুঝি না।

যেমন,
কবিতা লিখি, কবিতা পড়ি
আলোচনা করি কবিতা,
কিন্তু কেন, কি জন্য-
আমি বুঝি না।

কাব্যগ্রন্থ – অবিন্যস্ত দ্রোহে, অন্বেষা প্রকাশন।