।দুটো ছড়ার জন্মকথা।


1985 সালের জুন মাস থেকে দশ বছর আমরা ভদ্রেশ্বরে ছিলাম। ওই সময় রবিবার ও ছুটির দিনে, আমি সাইকেল নিয়ে চন্দননগর ও মানকুণ্ডু ঘুরে বেড়াতাম। একদিন পায়ে হেঁটে চুঁচুড়া (চুঁচড়ো) শহর ঘুরে দেখার ইচ্ছে হল। সেদিন সকাল সকাল লোকাল ট্রেন ধরে চুঁচড়ো চলে গেলাম। চুঁচড়ো স্টেশনে নেমে শুরু হল আমরা শহর পরিক্রমা। তখন ছিল শীতকাল। তাই পায়ে হেঁটে ঘুরতে কোনও অসুবিধে হচ্ছিল না। আমি স্বচ্ছন্দে এদিক-ওদিক বড়ো রাস্তা, ছোট রাস্তা ও অলিগলিতে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। ঘুরতে ঘুরতে শহরের এক প্রান্তে একটি বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে পড়লাম। নিম্নবিত্ত বাড়ি। ইটের দেওয়াল ও অ্যাসবেস্টাসের ছাউনিওলা সেই বাড়ির সামনের ফাঁকা উঠোনে দুদিকে দুটো বাঁশের খুঁটির ওপরে কাপড় টাঙানোর জন্য আড়াআড়িভাবে একটি লম্বা বাঁশ লাগানো আছে। সেই লম্বা বাঁশের ওপরে কয়েকটি কাঁথা ও দুটো বালিশ রোদে শুকোচ্ছিল। বালিশের ঢাকনাদুটো খুবই মলিন ও সেগুলোর জায়গায় জায়গায় ফুটো। বালিশ দুটোকে বাঁশে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। উত্তর দিক থেকে শীতের বাতাস বইছিল। সেই বাতাসে বালিশের ঢাকনার ফুটো দিয়ে তুলো বেরিয়ে উড়ে যাচ্ছিল। সেই দৃশ্য দেখে তৎক্ষণাৎ মনে মনে  'মুক্তি' নামে নীচের ছড়াটি লেখা হয়ে যায়।


বালিশের ঢাকনা
বলেছিল, "থাক-না।"
ঢাকনার কথা ফেলে
বালিশটা অবহেলে
মেলে দিল পাখনা।


পরের ছড়াটার জন্ম আমাদের অফিসের ক্যান্টিনে। তখন আমাদের অফিস শনিবারেও খোলা থাকত– অর্ধদিবস। দুপুরে ছুটির পরে আমরা ক্যান্টিনে গিয়ে জুটতাম। টুকটাক খেয়ে নিয়ে চায়ের কাপে তুফান তুলে চারটে/সাড়ে-চারটের সময় বাড়ি ফেরার জন্য উঠে পড়তাম। সেদিন ক্যান্টিনে ঢুকে দেখি গজাদা একটা টেবিলে তাঁর তিনজন সাগরেদকে নিয়ে জমিয়ে বসেছেন। চা খেতে খেতে গজাদা একনাগাড়ে কথা বলে চলেছেন– বাকিরা মনোযোগী শ্রোতার ভূমিকায়। আমি সেইখানে গিয়ে দাঁড়াতে গজাদা আমাকে বললেন, "আজ তুই কিছু বলবি না।" আমি বললাম, "ঠিক আছে, বলব না।" শুনলাম, গজাদা বলে চলেছেন,"বুঝলে, মার্ক্সবাদ হল পেঁয়াজের মতো, যার ছাড়াতে ছাড়াতে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। কিস্যু হবে না, বুঝলে হে, কিস্যু হবে না!" গজাদা একটি বামপন্থী দলের প্রাক্তনী। আগে মার্ক্সবাদ ও শ্রেণি সংগ্রাম নিয়ে তাঁর মুখে কথার ফুলঝুরি ছুটত। এহেন গজাদার মুখে এরকম কথা শুনে মনে মনে একটা ছড়া তৈরি হয়ে গেল। ঠিক করলাম, পরে কোনও একদিন গজাদাকে ওই ছড়াটা শোনাব।


পরের শনিবার ক্যান্টিনে খেতে নেমে দেখি গজাদা যথারীতি তাঁর পূর্বোক্ত তিনজন সাগরেদকে নিয়ে সেই একই টেবিলে রাজাউজির মেরে চলেছেন। আমি এগিয়ে গিয়ে তাঁকে বললাম, "আজ আপনি কিছু বলবেন না।" গজাদা সামান্য ভ্রু কুঁচকে বললেন, "ঠিক আছে, বল কী বলবি?" আমি তখন ভণিতা না করে বললাম, "বুঝলে, মার্ক্সবাদ হল পেঁয়াজের মতো, যার ছাড়াতে ছাড়াতে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। কিস্যু হবে না, বুঝলে হে, কিস্যু হবে না!" গজাদার বলা কথা কোট আনকোট বলে নিয়ে আমি আগের শনিবারের ছড়াটা বললাম। "এককালে আমি দিয়েছি অনেক লেকচার,/ যদিও লোকে বলত তা ছিল চিৎকার। / সব ছেড়ে দিয়ে হয়েছি গণৎকার,/ পেয়েছি শান্তি, রয়েছি চমৎকার!"


প্রতিশ্রুতি মতো, গজাদা একেবারে চুপ। আমি আর কথা না বাড়িয়ে, কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেলাম।


।অরি মিত্র।