অনেকে কবি পরিচয় দিতে লজ্জা পান। কেন পান? কবি কথাটি শুনলেই অনেকে তাচ্ছিল্য ভরে উচ্চারণ করে “কাকের চেয়ে কবি বেশি।” হয়তো এমন তাচ্ছিল্য ভরা মন্তব্যের কারণেই লজ্জা পান। আমি কবি কিনা জানি না। কবিতা লিখি। কবিতা হয় কিনা তাও জানি না। তবে কেউ কবি বলে যখন সম্বোধন করে তখন কিন্তু আমার লজ্জা লাগে না। কেন লাগে না? কারণ আর কোনো দেশের মানুষ সবাই কবি কিনা জানি না। বাংলাদেশে কিন্তু সবাই কবি। এদেশের মানুষ-ই শুধু নয়; পশুপক্ষীরাও কবি। কেমন করে?
শুনুন তাহলে বলছি।


কাক ঘুম থেকে জেগেই একে অপরকে বলে-
কা... কা... কা...
ময়লাগুলি খা
মালিকের ওঠোনটা
ঝাড়ু দিয়ে যা...(নিজস্ব)


ধান ক্ষেতে টুনটুনি বাসা বাঁধে। সংসার করে। গান গায়; উড়ে। আর বলে-
টুন... টুন... টুন...
শোন তোরা শোন
এবার ধানে ভরে দিবি
মালিকের ওঠোন। (নিজস্ব)


ভোর হলে মোরগ ডাকে। সকাল হবার সংবাদ ঘোষণা করে। অলস ঘুম হতে মানুষকে জাগিয়ে দিয়ে স্রষ্ঠার মহিমা ঘোষণা করে।


ভোর বেলাতে মোরগ ডাকে
ওঠো মুসলমান
অজু করে সালাত পড়ো
পড়ো আল-কুরআন। (নিজস্ব)


পাখিদের কবি হওয়ার কথা না হয় বুঝলাম। পশুরাও কবি হয় কেমন করে? আসুন দেখি পশুরা কিভাবে কাব্য চর্চা করে।


ভেড়ার শরীরে অনেক লোম। তার উমটুকু দিতে চায় বস্তির উলঙ্গ শিশুকে। তাই মানবিক ভেড়া কবিতা আওড়ায়-


খোয়ারের ভেড়াগুলো
বে... বে... ডাকে
উলগুলো দিয়ে আয়
বস্তির ছেলেটাকে। (নিজস্ব)
..........................


দুষ্টু ব্যাঙের বাচ্চার জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে মা ব্যাঙ কবিতা আওড়ায়-


ব্যাঙ ডাকে ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ
মারবো তোরে ল্যাঙ
লাফালাফি করবি যদি
ভেঙে দেবো ঠ্যাঙ। (নিজস্ব)


বাংলার প্রকৃতিও কিন্তু কবিতায় কথা বলে। যেমন-


ধানের ক্ষেতে বাতাস নাচে
ফিঙ্গে দেখে বলে-
ঝিঙে মাচায় হলুদ ফুলের
অঙ্গ কেন দুলে? (নিজস্ব)


কুমড়ো ডগা হাত বাড়িয়ে
ওঠলো মাচার প’রে
কঞ্চি শুধায় শূন্যে তুমি
ওঠলে কেমন করে? (নিজস্ব)


এই তো গেলো পশুপক্ষী আর প্রকৃতির কবি হয়ে ওঠার কথা। মানুষ কেন কবি হয়; কবিতা লিখে?


শিশু ভুমিষ্ট হয়ে কান্না করে। আর সে কান্না থামানোর জন্য জন্ম মাত্রই তার মায়ের মুখে প্রথম যে শব্দটি শোনে তা হলো-


না... না... কাঁদে না সোনা
তোমাকে যে গড়ে দেবো
হীরের গহনা। (নিজস্ব)


ঘুম পাড়ানি গান মায়ের মুখে একটি শিশু জীবনে কতবার কতভাবে শোনে!


ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি মোদের বাড়ি এসো
খাট নাই পালঙ নাই পিড়ি পেতে বসো
বাটি ভরে পান দেবো মজা করে খেও
খোকার চোখে ঘুম নাই ঘুম দিয়ে যেও। (লোক ছড়া)


অথবা শিশুর বুকে কোমল হাতের পরশ দিতে দিতে মা বলে-


খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো
বর্গী এলো দেশে
বুলবুলিতে ধান খেয়েছে
খাজ না দিবো কিসে? (লোক ছড়া)


অথবা ভাই-বোন, খালা-ফুফুদের কোলে চড়ে একটি শিশু কতবার শোনে-


আয় আয় চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা
চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা...


এসব ছড়া শোনতে শোনতে যখন একটি শিশুর মুখে প্রথম বোল ফোটে তখন শিশুটি বলতে শুরু করে-


মা... মা...পা... পা...দা... দা...
এ যেন স্বর্গলোক থেকে শিখে আসা গানের সারগাম! (নিজস্ব)


মা হাত ধরে শিশুকে হাঁটতে শেখায় আর বলে-


তাই তাই তাই
মামা বাড়ি যাই
মামী দিলো দুধভাত
মজা করে খাই... (লোক ছড়া)


যখন হাঁটতে শিখে যায় তখন বলে-


হাঁটি হাঁটি পা পা
যেথা খুশি সেথা যা... (লোক ছড়া)


এসব ছড়া ছন্দ কবিতা শিশু শোনে জন্ম থেকে তিন বছর পর্যন্ত। তার পরও কিন্তু থেমে যায় না শিশুর ছড়া শেখার পাঠ। এর পর আসে মুখস্তের পালা। বর্ণমালা শেখায় ছন্দে।
অ-তে অজু কর
আ-তে আযান হলে সালাত পড়। (নিজস্ব)


এভাবে সব বর্ণের ছড়া মুখস্ত হয়ে যাবার পর শিখে-


হাটটিমা টিমটিম
তারা মাঠে পাড়ে ডিম...রুকনুজ্জামান খান


আরেকটু বড় হলে শিখে-
বাঁশ বাগানের মাথার ওপর চাঁদ ওঠেছে অই
মাগো আমার শোলক বলা কাজলা দিদি কই...(যতীন্দ্র মোহন বাগচী)


তারপর শুরু হয় স্কুল জীবন। গদ্য মুখস্ত করার কোনো প্রয়োজন নেই। পাঠ্য বইয়ের ছড়া বা কবিতা মুখস্ত করতেই হবে। না হলে পরীক্ষায় ফেল।


এভাবে যখন একটি শিশুর মগজে গেঁথে যায় ছড়া বা কবিতার ছন্দ। তখন সে সব কিছুতেই ছন্দ খোঁজবে এটাই স্বাভাবিক। শিশুও কবি হয়ে ওঠে। মাকে বলে-


মাগো আমায় দেখাসনে আর জুজুপরীর ভয়
এখন তোমার ছেলে আর মা ছোট্ট খোকা নয়...


অথবা বলে-
বাণিজ্যেতে যাবো আমি সিন্দাবাদের মতো
পাহাড় সাগর অরণ্য মাঠ পেরিয়ে শত শত...


এবার বলুন একটি মানব শিশু বড় হয়ে সে কবি হবে না তো কী হবে?


এ তো গেল মানব শিশু জন্মের কথা। এবার বলি বাংলা ভাষা জন্মের কথা। বাংলা ভাষার জন্ম কবে থেকে? এই জটিল প্রশ্ন যখন ঘোরপাক খাচ্ছিল ইতিহাসবিদদের মাথায়, তখন ১৯০৭ সালে নেপালের রাজগ্রন্থাগার থেকে আবিষ্কার হলো চর্যাপদ। হাজার বছরের বেশি সময় ধরে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস পর্যালোচনা করে প্রমাণ করা হলো চর্যাপদই হলো বাংলা ভাষায় লিখিত প্রথম পুস্তক যা রচিত হয়েছিল ৯৫০ থেকে ১২০০ অব্দের মধ্যে। আর এর থেকেই সাব্যস্ত হলো বাংলা ভাষার জন্ম ৯৫০ অব্দে। কী আছে এই চর্যাপদে? এই চর্যাপদে আছে সাড়ে ৪৬টি পদ বা কবিতা। অবাক হওয়ার মতো বিষয় হলো এই ৩শত বছর রচিত ও পঠিত হয়েছে শুধু কবিতা। পরের দেড়শত বছরের লিখিত কোনো সাহিত্যই পাওয়া যায় না। কাব্য চর্চার এ ধারা চলে ১৩৫০ হতে ১৮০০ অব্দ পর্যন্ত। সাড়ে চারশত বছর ধরে রচিত হয় শুধু কবিতা। এর পর আধুনিক যুগে সাহিত্যের অন্যান্য শাখার বিকাশ ঘটলেও কবিতার জয়যাত্রা কিন্তু থেমে যায়নি। তা হলে কি বলতে পারি না কবিতা বাঙালির রক্তস্রোতে প্রবাহমান ধারা?


অতএব কাকের চাইতে কবির সংখ্যা বেশি হওয়া স্বাভাবিক নয় কি? যে কবিতা আমার পূর্ব পুরুষের রক্তে মিশে আছে, আমার মধ্যে প্রবাহিত হচ্ছে তাতে লজ্জিত হবার কী আছে? বরং গর্ব হওয়া উচিত।


আমি বলি-
আমার ভাষার জন্ম কবিতার মধ্যে
আমার জন্ম কবিতার মধ্যে-
আমার রক্তে বহে কবি ও কবিতার স্রোত
আমাকে যে তাচ্ছিল্য করে সে
মহা হারামীর পুত। (নিজস্ব)


তারা এদেশের বাঙালি নয়। তারা ইরান, পারস্য, আরব হতে এসে বাঙালি হয়েছে। বণিক হিসেবে ব্যবসা করতে এসে বাদশা হয়েছে। এদের রক্তে বাঙালির রক্ত নেই; আছে মিশ্র রক্ত। তাই কথায় কথায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখায়।


বাঙালির সমাজ, সংস্কৃতি, ধর্ম সবই তো কবিতা। লুইপা, কাহ্নপাদের চর্যাপদ, চৈতন্যদেব, বড়ুচণ্ডীদাসের মঙ্গলকাব্য, কালীদাসের মহাভারত, কৃত্তিবাসের রামায়ন, বিদ্যাপতি, চৈতন্যদেবের বৈষ্ণব পদাবলী, ১৯-২০ শতকের রবীন্দ্র, নজরুল, জীবনানন্দসহ আজ পর্যন্ত হাজার বছরের বেশি সময় ধরে শিরায় শিরায় প্রবাহিত রক্তে যে কবিতা ও কবিত্বের ধারা বয়ে চলেছে তাকে অস্বীকার করি কিভাবে?


আমার মা নিরক্ষর ছিলেন। তবুও আমি বিশ্বাস করি তার মধ্যে কবিত্ব ছিলো। তাই মহুয়া, মলুয়া, নদের চাঁদ, হোমরা বাইদ্যার কাহিনী, রূপবান, লখিন্দরের গল্প রাতভর শোনাতে পারতেন।


২০শতকে আমার জন্ম। ২১ শতকে আমি কবি। এই কবিত্ব হঠাৎ পাওয়া নয়। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। আমার পরিচয় আমি বাঙালি। আর বাঙালি মানেই কবি। এটা আমার অহঙ্কার। কাক বলো আর কবি বলো- এই অহঙ্কারের বশেই আমি কবি।
৩০-৭-২০১৮