সঙ্গীতে  কথা ও সুর উভয়েরই তুল্যমূল্য স্থান। তাই শুধু শব্দকে নিয়ে নয়, এর সঙ্গে সুর যোগ করে যে জিনিসটি পাওয়া যায়, তাই-ই সঙ্গীত । শব্দের ‘হুংকারটা হল শক্তি, এর পরিমাণ পাওয়া যায়, আর সঙ্গীত টা হল অমৃত, হাতে বহরে ওকে কোথাও মাপবার জো নেই।’ [বাতায়নিকের পত্র (২৪) ২৯৭] আসলে গানের মধ্যে গীতিকারের গানের প্রাণপ্রতিষ্ঠায়, সুরকারের কারিগরি বিদ্যার পাশাপাশি গায়ক বা গায়িকার কণ্ঠমাধুর্য আর পরিবেশন-দক্ষতা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। এভাবে তিনটি শিল্পীসত্তার সম্মিলনে গান হয়ে ওঠে রসোচ্ছল ও প্রাণদীপ্ত। সেই শিল্পীসত্তারই  একজন  হলেন কমল দাশগুপ্ত ,বিরল সুরস্রষ্টা হিসেবে মানুষের হৃদয়ভূমিকে তিনি  নাড়িয়ে দিয়ে যাননি শুধু, বাংলা গানের জগতে রীতিমতো স্থায়ী আসন পেতে আছেন।
বাংলা গানের স্বর্ণযুগ বলতে বুঝি ১৯৪০ এর দশক থেকে ১৯৭০ দশকের আধুনিক  ও ছায়াছবির বাংলা গান। কালজয়ী বহুগানের স্রষ্টা যে সকল সুরকার  স্বর্ণযুগের বাংলা গানের ইতিহাসে  উজ্জ্বল আপন স্বাক্ষর রেখে গেছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম সেরা  হলেন ভারতীয়  উপমহাদেশের  অন্যতম  প্রথিতযশা  সঙ্গীতশিল্পী, ও  কিংবদন্তী  সুরকার  কমল দাশগুপ্ত।বস্তুত  বাংলা গানের স্বর্ণযুগ সৃষ্টি তাঁর হাত ধরেই।  


জন্ম, পরিবার ও শিক্ষা  :


সত্যধর্মের অন্যতম প্রচারক মহাত্মা মহিমচন্দ্রের বংশে কমল দাশগুপ্তের জন্ম। তাঁর পিতার নাম  তারাপ্রসন্ন দাশগুপ্ত।ক্রীড়াজগতের স্বনামধন্য পঙ্কজ গুপ্ত সম্পর্কে তাঁর মাতুল ছিলেন ।  সুরসাধক  কমল দাশগুপ্ত  ১৯১২ সালের  ২৮ জুলাই  ব্রিটিশ  ভারতের  যশোরে   নড়াইল  জেলার  কালিয়া  থানার বেন্দা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পাঁচ ভাই (তাঁদের মধ্যে দু –ভাই অবশ্য খুব ছোট বয়সে মারা যান ) ও  তিন বোনের মধ্যে  বড়দা  বিমল দাশগুপ্ত  এবং  কনিষ্ঠ  সুবল দাশগুপ্ত ছিলেন  সঙ্গীত  জগতের  প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্ব।
বড়দা  প্রফেসর  বিমল  দাশগুপ্ত  শুধু  কৌতুক  গায়ক  ছিলেন  না, একজন  ভারত  বিখ্যাত  যাদুকরও  ছিলেন। যাদুবিদ্যায়  মুন্সিয়ানার  জন্য ‘প্রফেসর’ উপাধি পান। বিমল দাশগুপ্ত  নজরুলের  হাসির গান—বিয়ের  আগে  ও  পরে , পন্ডিত মশায়ের  ব্যাঘ্র  শিকার (১ম ও ২য় খন্ড-এন-৭১৮০, ১৯৩৩ সাল), বদনাগারুতে  টিকি আর টুপিতে —এগুলির  সফল  শিল্পী। সুবল দাশগুপ্ত  চলচ্চিত্র  শিল্পের  সুরকার  শুধু  নয়, একজন  ভালো  তবলা  বাদকও  ছিলেন।সুবল দাশগুপ্ত নজরুলের  অনেক  গানে  সুরারোপও  করেছেন।  কবি  নজরুল শুধু   বিমল, সুবল—কমল নয়, পরিবারের অন্য তিন বোনের কণ্ঠ রেকর্ডিং জগতে ব্যবহার করতে কোরাস গানের আয়োজন করেছিলেন ।  কখনো সাধক সংঘ, আবার কখনও ‘বাংলার ছেলেমেয়ে’ ও ‘শিশু মঙ্গল সমিতি’ নামে রেকর্ড করিয়েছিলেন ।
ব্যবসায় সূত্রে ও মহারাজার ক্রিকেট টিমের পরিচালক হিসেবে পিতা তারাপ্রসন্ন দাশগুপ্ত একসময় কুচবিহারে ও পরে কুমিল্লায় বসবাস করেন। সেই কারনে   কমল দাশগুপ্তের  শৈশব কাটে কালিয়াতে, কৈশোর কুচবিহারে ও কলকাতায় ,কলেজ জীবন কুমিল্যায় , এরপর কলকাতার মানিকতলার  বাড়িতে ,পার্ক সার্কাসের ভাড়া বাড়িতে ,অবশেষে  ১৯৬৭ সাল থেকে মৃত্যু পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকায় ।
    ১৯২৮ সালে  ক্যালকাটা অ্যাকাডেমি থেকে ম্যাট্রিক এবং পরে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে বিকম পাস করেন । এরপর  কলকাতায়  এসে  শুরু  হল  নজরুলের নিকট তাঁর সুরের মায়াজাল বোনা( ১৯৪২ পর্যন্ত , কারণ এরপর থেকেই নজরুল অসুস্থ হয়ে পড়লেন)। সহযোগী হিসেবে কাজ করলেও মাস্টার কমল নামে তিনি  নজরুল সঙ্গীত গেয়েছেন। ১৯৩৪ সাল থেকে স্বাধীনভাবে কাজী নজরুল ইসলামের গানের সুরারোপ করতে থাকেন। প্রায় তিনশো নজরুলগীতির সুর রচয়িতা ছিলেন কমল দাশগুপ্ত। উত্তর ভারতের মীরার ভজনে সুরের প্রয়োগ বিষয়ে গবেষণা করে কমল দাশগুপ্ত ১৯৪৩ সালে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট অব মিউজিক ডিগ্রি লাভ করেন। সুরের রাজ্যে কমল দাশগুপ্ত ছিলেন প্রকৃতই  এক জীবন্ত কিংবদন্তি।


সঙ্গীত শিক্ষা, সংগীতময় উজ্জ্বল কর্মজীবনঃ


  সঙ্গীতে  ওস্তাদ  জমিরুদ্দীন খাঁ, কাজী নজরুল ইসলাম, কৃষ্ণচন্দ্র দে (১৮৯৩-১৯৬২), ডিএল রায়ের ছেলে দিলীপকুমার রায়ের (১৮৯৭-১৯৮০) কাছে পাঠ নিলেও প্রাথমিক পাঠ নিয়েছিলেন তাঁর পিতা তারাপ্রসন্নের কাছে ও পরে বড় ভাই বিমল দাশগুপ্তের কাছে।  পাশ্চাত্য সঙ্গীতে পাঠ নেন এইচএমভির অর্কেস্ট্রা-পরিচালক নিউম্যানের কাছে। আর, প্রায় শ-পাঁচেক রবীন্দ্রসঙ্গীত  শেখেন ব্রজেন গাঙ্গুলি ও অনাদি দস্তিদারের কাছে।
২৩ বছর বয়সে হিজ মাস্টার্স ভয়েস গ্রামোফোন কোম্পানীর সঙ্গীত-পরিচালক ও সুরকার হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন কমল দাশগুপ্ত।   খুব কম সময়ের মধ্যে তাঁর প্রতিভা ও নিষ্ঠার গুণে বাংলা গানের মুলুক ছাড়িয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন সর্বভারতীয় পর্যায়ে। তাঁর সুরের প্রতি আস্থাশীল ছিলেন বলেই নজরুল ইসলাম ‘কমল দাশগুপ্তকেই দিয়েছিলেন অনুমোদন ছাড়াই তাঁর গানে সুর করার অধিকার।’কমল দাশগুপ্ত সম্পর্কে নজরুল নাকি বলেছিলেন, 'কমল আমার গানে সুর করলে, সুপাত্র কন্যাদান করলে পিতার যে অনুভুতি হয়, আমারও সেইরকম আনন্দ হয়'।
এরপর কলাম্বিয়া রেকর্ড কোম্পানীতেও কর্ম সম্পাদন করেন। এছাড়াও তিনি রেডিও অডিশন বোর্ডের প্রধান ছিলেন এবং রেডিও বাংলাদেশের ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিসের প্রধান সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন তিনি। কমল দাশগুপ্ত ছিলেন প্রথম বাঙ্গালী যিনি উর্দু ভাষায় কাওয়ালি গান পরিবেশন করেন। এইচএমভিতে এক মাসে তিপ্পান্নটি গান রেকর্ড করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। রেকর্ডসংখ্যক গানে সুর করার জন্য ১৯৫৮ সালে এইচএমভিতে তাঁর সিলভার জুবিলিও  অনুষ্ঠিত হয়।
কমল দাশগুপ্তের বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তিনি শিল্পীর মন পড়তে পারতেন। শিল্পীর গায়কী অনুযায়ী গানের সুর করতেন। গান রেকর্ডিংয়ের আগে তিনি শিল্পীর সঙ্গে দীর্ঘ সময় ব্যয় করতেন। তাই শুধু শিল্পী, সুরকার বা সঙ্গীত নয়, কমল দাশগুপ্তের জাদুকরী কর্মকাণ্ডের সমান অংশীদার ছিল মানসিক প্রসারতা। তিনি নিজে শিল্পীর কাছে যেতেন, চিনতেন, তারপর একসঙ্গে কাজ করতেন। সঙ্গীতের ক্ষেত্রে তার মৌলিক অবদান স্বরলিপির শর্টহ্যান্ড পদ্ধতির উদ্ভাবন এবং স্টাফ নোটেশন পদ্ধতির স্বরলিপি স্থাপন।
কমল দাশগুপ্ত গ্রামোফোন কোম্পানিতে একজন তবলাবাদক হিসেবে প্রবেশ করে বাজাতেন ম্যান্ডোলিন ও জাইলোফোন। তিনি যন্ত্রীদের নিয়ে একটি দলও গঠন করেন। এসব কাজের পাশাপাশি তিনি যূথিকা রায়কে ও কলকাতার ‘কস্ত্তরবা সংগীত বিদ্যালয়ে’ গান শেখাতেন। এভাবে সংগীতজগতে আগমন হলেও ‘তাঁর উদ্ভাবনী-শক্তি, মৌলিক প্রতিভা, নিরীক্ষাপ্রিয়তা ও অসামান্য মেধা তাঁকে খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে যায়।’
  তিনি শুধু বাংলা ভাষায় নয়, হিন্দি, মারাঠি, তামিল, উর্দু প্রভৃতি ভাষার গানে সুরারোপ করেন। বহু আধুনিক বাংলা, উর্দু, হিন্দি, ঠুমরি এবং ছায়াছবির সঙ্গীতে কণ্ঠদান ও সুরারোপ করেছেন।
নজরুল ইসলামের গান তাঁর ভিত গড়ে দিলেও প্রণব রায় (১৯১১-৭৫), অজয় ভট্টাচার্য, শৈলেন রায়, বাণীকুমার, সুবোধ পুরকায়স্থ, মোহিনী চৌধুরী, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্যামল গুপ্ত, অনিল ভট্টাচার্য-রচিত গানে সুর সৃষ্টির মাধ্যমে কমল দা শগুপ্ত শুধু জনপ্রিয় হয়ে ওঠেননি, সৃষ্টি করেন বাংলা গানের একটি নতুন ধারা।ত্রিশ এবং চল্লিশের দশকে গ্রামোফোন ডিস্কে তাঁর সুরে গাওয়া বহু গান অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। গানগুলোর গীতিকার ছিলেন প্রণব রায় এবং কণ্ঠশিল্পী ছিলেন যুথিকা রায়। এঁদের গান ছাড়া তিনি সুর দিয়েছেন পদাবলী কীর্তনে; মীরা, কবির ও সুরদাসের ভজনে; হিন্দি গীতিকবি  কামাল আমরোহি, মহম্মদ বক্স, ফৈয়াজ হাশমি, রাজেশ্বর গুরু, মুনির আলম, হসরত জয়পুরির গীত, গজল ও ভজনে।
আমেরিকার ফিল্ম ডিরেক্টর এলিস জনসনের War Propaganda ছবিতে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক তাঁর বিশেষ কৃতিত্ব।
তিনি সর্বমোট সাত হাজারের বেশী  গানে শুধু সুর নয়, তা শিখিয়ে শিল্পীর কণ্ঠে রেকর্ডও করিয়েছিলেন।
বাংলা চলচ্চিত্রের সুরকার হিসেবে কমল দাশগুপ্ত প্রভূত খ্যাতি অর্জন করেন। তার সুর দেয়া ও গাওয়া ‘তুফান মেল’, ‘শ্যামলের প্রেম’, ‘এই কি গো শেষ দান’ চলচ্চিত্রের এই গানগুলো এককালে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল। অনেক হিন্দি ছায়াছবিতেও তিনি সঙ্গীত পরিচালনা করেন। প্রায় ৮০টি ছায়াছবিতে সঙ্গীত পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি বাংলা ছবির সংগীত-পরিচালক হিসেবে চারবার ও হিন্দি ছবির জন্যে একবার, মোট পাঁচবার শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালকের পুরস্কার লাভ করেন। এই মহৎ শিল্পীর অবদান ও তাঁর প্রতিভার স্বীকৃতি স্বরূপ, ‘বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী’ তাঁকে জাতীয় পুরস্কারে সম্মানিত করেন।
তাঁর সুরারোপিত এরকম কিছু গান উল্লেখ করতে পারি যার  স্মৃতিচারণে অনেকেই হয়ত নস্টালজিক হয়ে পড়বেন।  : ‘আমি ভোরের যূথিকা’ (যূথিকা রায় ), ‘সাঁঝের তারকা আমি’ (ওই), ‘শতেক বরষ পরে’ (ওই), ‘এমনি বরষা ছিল সেদিন’ (ওই), ‘মেনেছি গো হার মেনেছি’ (জগন্ময় মিত্র), ‘আমি ভুলে গেছি তব পরিচয়’ (ওই), ‘তুমি কি এখন দেখিছ স্বপন’ (ওই), ‘ভালোবাসা মোরে ভিখারী করেছে’ (ওই), ‘আমি দুরন্ত বৈশাখী ঝড়’ (ওই), ‘, ‘পৃথিবী আমারে চায়’ (সত্য চৌধুরী), ‘যেথা গান থেমে যায়’ (ওই), , ‘মোর হাতে ছিল বাঁশি’ (গৌরীকেদার ভট্টাচার্য), ‘তোমার জীবন হতে’ (হেমন্ত মুখোপাধ্যায়), ‘ঘুমের ছায়া চাঁদের দেশে’ (তালাত মাহমুদ) ,  ‘এই কি গো শেষ দান’ (ফিরোজা)  ‘ ‘চরণ ফেলিও ধীরে ধীরে প্রিয়’, ‘দু’টি পাখি দু’টি নীড়ে’, ‘গভীর নিশিথে ঘুম ভেঙ্গে যায়’, ‘আমার যাবার সময় হলো’, ‘তুমি হাতখানি যবে রাখো মোর হাতের ‘পরে’,  ‘আমি বনফুল গো’ ও ‘হার মেনেছি গো হার মেনেছি’ ইত্যাদি...কত আর বলি বলুন তো। ১৯৪২ শে ‘কতদিন দেখিনি তোমায়’ গান টিতে (প্রনব রায়ের লেখা )  সুর দিয়ে  নিজেই  গাইলেন এবং রেকর্ড আকারে তা প্রকাশিত হল। আজও সে গান কালজয়ী হয়েই আছে।পরে অবশ্য মান্না দে এই গানটি আবার গেয়েছিলেন ১৯৭২ তে  যা কিনা সেরা বাংলা গান রুপে আজ ইতিহাসে অন্তর্ভুক্ত  ।
তিনি সুর সৃষ্টির পাশাপাশি বেশকিছু গানও রচনা করেন। তার মধ্যে ‘মম যৌবন সাথী বুঝি এলো’, ‘বিফলে যামিনী যায়’, ‘কে আজি দিল দোলা’ গান তিনটি সুরারোপ করে ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দে রেকর্ডও করা হয়।
কমল দাশগুপ্ত অনেক বাংলা চলচ্চিত্রে সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে সৃজনশীলতার পরিচয় দেন। তার মধ্যে শেষ উত্তর, যোগাযোগ, চন্দ্রশেখর ও শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য ছবিগুলি পশ্চিমবঙ্গে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার পায়।
এছাড়া প্যাহেচান, ইবান কি একরাত, এ্যারাবিয়ান নাইটস ইত্যাদি হিন্দী ছবিতেও সুর সংযোজন করেন। গড়মিল, জবাব, হসপিটাল, নববিধান, ভাবীকাল,  বিদেশিনী, প্রার্থনা, মন্দির, বঞ্চিতা, রাঙামাটি, মেঘদুত, মধুমালতী, গোবিন্দদাস, বধুঁবরণ ইত্যাদি ছবিতে তিনি সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
    চতুর্থ দশকের মধ্যভাগ থেকে শ্রীমোহিনী চৌধুরী তাঁর গানে গণ-বিক্ষোভ এবং গণ-মানসের যে ছাপ এঁকেছিলেন  তা ছিল এককথায় অসাধারন,  আর তাতে সুর করেছিলেন কমল দাশগুপ্ত। তাঁর কয়েকটি গণচেতনার গানের প্রথম পঙ্ক্তি : ১. মুক্তির মন্দির সোপানতলে, ২. পৃথিবী আমারে চায়, ৩. আমি দুরন্ত বৈশাখী ঝড়, ৪. যাদের জীবন ভরা শুধু আঁখিজল, ৫. শতক বরষ পরে, ৬. জেগে আছি একা জেগে আছি কারাগারে, ৭. ভেঙেছে হাল ছিঁড়েছে পাল। মোহিনী চৌধুরীর এই কয়টি  গান কমল দাশগুপ্তের সুরে সত্য চৌধুরী ও যূথিকা-জগন্ময়ের কণ্ঠে পরিবেশিত হয়ে কালজয়িতা লাভ করেছিল।


জীবনের ওঠা-পড়া ঃ


খ্যাতির মধ্য গগনে থাকাকালীন  কমল দাশগুপ্তের তখন প্রচুর আয়। অর্থের প্রতি কোন মোহই ছিলনা তাঁর। তিনি ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষক, মহৎ ব্যক্তিত্বের অধিকারী ও দুঃখীজনের বন্ধু। ১৯৪৩ সালে সারা ভারতবর্ষ যখন দুর্ভিক্ষের কবলে পতিত তখন কলকাতায় দুর্ভিক্ষ পীড়িত  মানুষের পাশে এসে দাঁড়ালেন কমল দাশগুপ্ত। নিজ খরচে নঙ্গরখানা খুলে প্রতি দিন একশত করে লোক খাওয়াতেন তিনি। তাঁর এই মহৎ প্রচেষ্টা প্রায় মাসব্যাপী অব্যাহত ছিল।
বাবা ও বড়দার মৃত্যুর পর মাকে কথা দিয়েছিলেন তিনি পরিবারকে দেখবেন।  সংসার দেখতেন মধুময় স্নেহে। তাঁর নিজের বিয়ের কথা যখন উঠলো, তখনই মা ও কনিষ্ঠ ভ্রাতা সুবল মারা গেলেন (১৯৫২)  । এ সময় শোকে কাতর কমল একটি চলচ্চিত্র প্রযোজনায় হাত দেন। কিন্তু ফ্লপ হওয়ায় সর্বশান্ত হন। তখন থেকেই সৃষ্টিশীলতা থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগলেন।
যে কমল দাশগুপ্ত ১৯৪৬ সালে সাঁইত্রিশ হাজার টাকা আয়কর দেন, গাড়ি ছাড়া চলতেন না, সেই কমল দাশগুপ্তর জীবনে আসে একের পর এক  বিপর্যয়।  যূথিকার প্রত্যাখ্যান,  পারিবারিক সংকট (ভাই সুবল দাশগুপ্তের অকাল মৃত্যু)  ও নাথ ব্যাংকে লালবাতি জ্বলায় পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব, রিক্ত হয়ে পড়েন। বাড়ির বিশ্বস্ত পরিচারক অবশিষ্ট যেটুকু জমা ছিল তাও নিয়ে একদিন উধাও হয়ে যায়। আর্থিক ও মানসিকভাবে কমল দাশগুপ্ত যখন সর্বহারা ও বিপর্যস্ত, তখন ফরিদপুরের মেয়ে ফিরোজা  ( বেগম) অসমবয়সী(ফিরোজা কমল দাশগুপ্তের চেয়ে ১৮ বছরের ছোট ছিলেন) এ -মানুষটির হাত ধরে শুধু জাগিয়ে তোলেননি, জড়িয়ে নিলেন নিজের জীবনের সঙ্গে। মনে রাখতে হবে,  গোপালগঞ্জের  জমিদার খান বাহাদুর মোহাম্মদ ইসমাইলের মেয়ে কলকাতায় হিন্দু যুবকের সঙ্গে প্রেম করছেন, এমন ছবি চল্লিশ ও পঞ্চাশ দশকে অকল্পনীয় ছিল৷
১৯৫৫ সালে যখন কমল-ফিরোজার বিয়ে হয় , তখন কমলের বয়স ছিল ৪৩ বছর । ফিরোজার বাড়ীর কেহই মেনে নিতে পারলেন না এই অসম বিবাহ। বিয়ের পরে থাকা শুরু হল পার্ক সার্কাসের একটি  ভাড়া বাড়ীতে । চরম অর্থনৈতিক কষ্টে দিন কাটছিল  তখন তাঁদের। এই কলকাতাতেই  তাঁদের সন্তান তাহসীন, হামিন ও শাফিনের জন্ম হয়।ততদিনে অবশ্য  তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেছেন এবং নাম নিলেন  কাজি কামাল উদ্দিন। এই অর্থনৈতিক সঙ্কট থেকে আর বেরোতে পারেন নি কমল জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত।
১৯৪২ থেকে ১৯৫১ পর্যন্ত–কত সুর, কত গান ,কত খ্যাতির চরম শিখরে থেকেও, সব কিছুকে তুচ্ছ করে শুধু ফিরোজার প্রেমের সুরেতে মজে ছিলেন। চরম আর্থিক সঙ্কট, অবজ্ঞা ,দেশত্যাগ ,সে দেশেও গিয়ে যোগ্য সম্মান না পাওয়া ,নেশাসক্তি এবং চরম অবহেলা সত্বেও জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ফিরোজার কাছেই থাকতে চেয়েছিলেন কিংবদন্তী সুরকার কমল দাশগুপ্ত।


শেষের দিনগুলি ঃ


সৃষ্টির জগত থেকে কমলের  নিজেকে অনেকটাই গুটিয়ে রাখা, নেশাসক্তি,সরকারি অবহেলা,  আর্থিক সমস্যা মিটবে জেনেও ফিরোজার বাণিজ্যিক ছায়াছবিতে গান না করার সিদ্ধান্ত, তীব্র আর্থিক সঙ্কট  সবমিলিয়ে কলকাতার জীবন তাঁদের কাছে দুঃসহ মনে হয়েছিল যখন,ফিরোজার  ভ্রাতা আসাফদ্দৌলার ইঙ্গিতে তাঁরা তখন  সপরিবারে ঢাকা চলে যান (১৯৬৭ সালে ), পাকাপাকিভাবে থাকার উদ্দেশ্যে।
কিন্তু  তৎকালীন পূর্ব পাকিসত্মানে আসার পর কমলের  কোনো জায়গা হলো না যেন। এ-বিষয়ে আবুল আহসান চৌধুরী বলেন, ‘একদিকে কলকাতা তাঁকে ফিরিয়ে দিয়েছে, কিন্তু ঢাকাও তাঁকে গ্রহণ করে নি। সেই সময় সরকারও তাঁর প্রতি প্রসন্ন ছিল না। কোনো প্রতিষ্ঠানও এগিয়ে আসে নি তাঁর মেধা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর জন্যে। আরও লজ্জার ও দায়ের বিষয়  এই যে, কমল দাশগুপ্তকে জীবিকার জন্যে শেষজীবনে ঢাকায় একটা মুদিখানার দোকান খুলতে হয়েছিল।’
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। ঢাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে গীতিকার ও বেতার কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম প্রস্তাব দেন বেতারের নিজস্ব স্টুডিও এবং বিশেষ বাদ্যযন্ত্রী গোষ্ঠী তৈরি করার। জন্ম নিল ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিস। সবই কমলের পরিকল্পনা। নানা ধরনের গানসহ কাওয়ালী গান রেকর্ড করেন কমল। আর চলŽŽচ্চিত্রে ‘কেন এমন হয়’ ছবির সঙ্গীত পরিচালনা করেন। প্রিয়তমা ফিরোজার নাম নিয়ে ‘নজরুল গীতিমালা’ নামে বাংলা একাডেমি থেকে স্বরলিপি প্রকাশ করতে থাকেন।কিন্তু এরপর থেকেই অসুস্থ হতে থাকেন কমল।, বঙ্গদেশের অসাধারণ কিংবদন্তী   শিল্পী ও সুরকার কমল দাশগুপ্তকে অনাদরে-অবহেলায়, এক প্রকার বিনা চিকিৎসায় ১৯৭৪ সালের ২০ জুলাই মাত্র ৬২ বছর বয়সে নীরবে চলে যেতে হলো...  না -ফেরার দেশে।
নজরুলের প্রায় দুশো গানের সুর আর স্বর্ণযুগের অবিস্মরণীয় গানগুলি আজ তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছে আমাদের মাঝে।  এত অমোঘ সৃষ্টির বিনিময়ে আমরা  তাঁর বেঁচে থাকার সময়েও দিতে পারিনি যোগ্য সম্মান ,আর মরণের পরেও  সার্বিক ভাবে সেভাবে স্মৃতিচারণ কখনও করিনি বিনম্র শ্রদ্ধার সাথে।  বারে বারে  তাই  কেন জানি না  শুধু মনে হয় এত অবহেলা কি তাঁর প্রাপ্য ছিল?  
                   -----------------
তথ্যসূত্রঃ ১। সুবোধ সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু-সম্পাদিত, সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান (সংসদ, কলকাতা ২০০২)  
২। গৌতম সান্যাল,  ‘জানি একদিন আমার জীবনী লেখা হবে : গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার’, তথ্যসূত্র, ২১ বর্ষ, ২০১৬,
৩।সিতাংশুশেখর ঘোষ, বিমানে বিমানে আলোকের গানে (তৃতীয় সংস্করণ, কলকাতা ২০০৫
৪।  নজরুল গীতি অন্বেষা, সম্পাদনা- কল্পতরু সেনগুপ্ত, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রাঃ লিঃ, কলকাতা, জুলাই-১৯৭৭।
৫। কল্যাণবন্ধু ভট্টাচার্য, ‘সুরকার কমল দাশগুপ্ত’, সাহিত্য ও সংস্কৃতি, কার্তিক-পৌষ ১৩৮৩,
৬। মান্না দে, জীবনের জলসা ঘরে (আনন্দ, তৃতীয় মুদ্রণ, কলকাতা ২০০৯  
  ৭। আবুল আহসান চৌধুরী, ‘কমল দাশগুপ্ত : হারানো হিয়ার নিকুঞ্জ পথে’, বাংলাদেশের হৃদয় হতে, সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক ত্রৈমাসিক, পঞ্চম বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা, অগ্রহায়ণ ১৪১৯।
৮।.  সুব্রত রায়চৌধুরী-সম্পাদিত, গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ পত্রিকা তথ্যসূত্র, ২১ বর্ষ, ২০১৬।
৯।https//bn.m.wikipedia.org.>komol
১০।Bn.banglapedia.org