কবিতায় ধরাবাঁধা সেই ছন্দ (মাত্রা গুনে) আবশ্যক কিনা সে নিয়ে আলোচনায় যাবো না। তবে ছন্দ টা কবি ও পাঠকের উভয়ের জানা থাকলে কবিতার স্বাদ আস্বাদন করা সহজ হয়ে উঠে এটা বলতেই পারি।

"নয়তো বাঁচাল পেছা বলছি
দেবো এক ঘা কাঙাল,
বাপ-টাকে তোর কবর থেকে
আয় নিয়ে আয় সানাল!"

কবিতার লাইন গুলো পড়ুন। প্রথম দুটো লাইন ঠিকঠাক পড়লেও, তৃতীয় লাইনটায় অর্থের কিছুটা গোলমালে মনে হতে পারে আপনার কাছে। এ কেমন কথা! "বাপ-টাকে, তোর কবর থেকে" এটা কি কোনো সার্থক বাক্য? আসলেই তা হয় না। মরলাম-ই না যখন, তখন আমার কবর কোথা থেকে আসবে! কিন্তু আপনি যদি "বাপ-টাকে তোর" একটানে পড়ে "কবর থেকে" আবার আরেক টানে পড়তেন। তাহলে হয়তো আপনার কাছে ভুলটা মনে নাও হতে পারতো। তবুও মনে প্রশ্ন জাগতে পারে  কেনো আপনি এমন পড়বেন! কবি তো " বাপ-টাকে তোর" এরপরে কোন কমা চিহ্ন ব্যবহার করেননি! আসলে কবির এখানে কমা ব্যবহার না করায় তাঁকেও দোষ দেয়া যাবে না। কবি ঠিকঠাকই লিখেছেন। আপনি কবিতার ছন্দের সাথে ঠিকঠাক পরিচিত নন বলেই এমনটা মনে হচ্ছে।

তাহলে আসুন জেনে নেই, ছন্দ আসলে কি? কবিতায় ছন্দ হলো নিদিষ্ট মাত্রায় সাজানো অক্ষর সমূহের সমন্বয়ে পাওয়া শ্রুতিমধুর ধ্বনি। ব্যাখাটা দিচ্ছি। তার আগে বলে রাখি, ছন্দ তিন প্রকার।
১. স্বরবৃত্ত ছন্দ
২. মাত্রাবৃত্ত ছন্দ ও
৩. অক্ষরবৃত্ত ছন্দ।
তবে কেউ কেউ অমিত্রাক্ষর ছন্দকে নিয়ে মোট চার ভাগেও ভাগ করে থাকেন।

উপরের কবিতাংশে, "বাপ-টাকে তোর" এই অংশ টুকু আগে ভাঙি। এইবার এটিকে ধীরে ধীরে উচ্চারণ করে ভাঙার চেষ্টা করুন। বাপ+টা+কে+তোর, এই চারটা খণ্ডিত অংশেই কিন্তু ভাঙ্গা যায়। এর বেশি বা কম কিন্তু হয় না। এই খন্ডিত অংশের প্রত্যেকটিকে বলা হয় এক একটি অক্ষর। তার মানে শব্দের যে ছোট অংশটুকু আমরা একসাথে একত্রে উচ্চারণ করতে পারি তাকেই অক্ষর (ইংরেজিতে সিলেবল) বলে। অক্ষর আবার দুই প্রকার।
১. মুক্তাক্ষর
২. বদ্ধাক্ষর

স্বরবৃত্তে সব অক্ষরকেই যেহেতু এক মাত্রায় গুনা হয়, তাই আমি এদের ব্যাখ্যায় যাবো না। আসুন কবিতায় ফিরে যাই। "বাপ-টাকে তোর" এখানে চার টা অক্ষর বা চার টা মাত্রা আছে। একই ভাবে "কবর থেকে" কে ভাঙুন আরো একবার। ক+বর+থে+কে। মোট চারটা অক্ষরই কিন্তু হয়! তারমানে এখানেও চার মাত্রা। আগেও চার, এখানেও চার।
এবার দ্বিতীয় লাইনে আসুন। "আয় নিয়ে আয়" ও "সানাল"। " আয় নিয়ে আয়" এটাকে ভাঙলে পাবেন, আয়+নি+য়ে+আয়। মোট চারটা অক্ষর বা চার মাত্রা। "সানাল"এ আছে আরো দুই মাত্রা (সা+নাল)। তাহলে কবিতার প্রথম লাইনে আছে ৪+৪ ও নিচের লাইনে ৪+২ মাত্রা করে। এবার আপনি কেবল ৪ মাত্রা এক টানা উচ্চারণ করে করে পুরো কবিতাটা আবার পরুন। দেখবেন কবিতা পড়ার একটা আলাদা আনন্দ খুঁজে পাবেন। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনান্দ দাস এমন কি এ যুগের বড় বড় কবিরাও এই ধরনের কোনো না কোনো ছন্দেই লিখে থাকেন।

আপনি এই বইয়ের প্রথম থেকে কয়েকটা কবিতা পড়ে আবার লেখায় ফিরে আসুন আগে। দেখুন বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে কিনা।  প্রথম দিকে একটু অসুবিধা হলেও, বুঝতে পেরে গেলে দেখবেন কোন সমস্যাই হবে না।

ও..বলে রাখি, এই যে চার মাত্রা করে আপনি একসাথে পড়লেন, এগুলো কে কবিতায় ভাষায় বলা হয় পর্ব। স্বরবৃত্তের কবিতায় পর্বের সংখ্যা সবসময়ই সমান হতে হয়। আর ঐ দুই মাত্রার " সানাল" পড়লেন, এটাকে বলে অতিপর্ব। কেননা, এগুলো মূল পর্বের মতো চার মাত্রায় হয়নি, অতিরিক্ত হয়েছে। স্বরবৃত্তে পূর্ণ পর্ব চার মাত্রায় হয়। কোনো কোনো কবিতায় এই ছোট পর্বটা যদি বাক্যের সামনে থাকে, তাকে বলে উপপর্ব! অতিপর্ব বা উপপর্বে অক্ষর বা মাত্রা সংখ্যা ১,২ বা ৩ সংখ্যারও হতে পারে।

"সেদিন সে চাইলো লুচি
দিলাম যেই কয়েক কুঁচি
অমনি ঐ দিলো থাপ্পর,
জোরসে এই কানের উপর!"

উপরের কবিতাংশটা কি একটু গোলমেলে লাগছে? আসলে এর মূল পর্ব (৪ মাত্রার) পরে আছে। আর উপপর্বটি আগে (৩ মাত্রার)।
যেমনঃ
সেদিন সে (৩) চাইলো লুচি (৪)
দিলাম যেই (৩) কয়েক কুঁচি(৪)
অমনি ঐ (৩) দিলো থাপ্পর,(৪)
জোরসে এই (৩) কানের উপর!(৪)
- একই ভাবে নিচের অংশটাও।

"বলে কি,"এইটুকু যে!
আর কি নাই! পুরোটা দে?"
ভাবছি যেই, দিবো কামড়
ঘুসি দুই গালের উপর!"

চতুর্থ লাইনে মাত্রা ছন্দ না বুঝলে আপনি হয়তো পড়তে পারেন, "ঘুসি", "দুই গালের উপর!" তাই ছন্দ জানলে পড়তে ভালো লাগে।
আবার স্বরবৃত্তে অতিপর্ব, উপপর্ব থাকতেই হবে এমন কোন কথা নেই। নিচের উদাহরণ টি লক্ষ্য করুন।

চাই না আমি (৪) তাকাও ফিরে(৪)
পড়ুক শিকল(৪) পা'য়ের বেড়ে,(৪)
খচখচে মন (৪) সত্যি জাগুক(৪)
দাড়াও আবার(৪) বায়না ধরে।(৪)

কি! এবার পড়ে কিছুটা আনন্দ অনুভূত হচ্ছে।আরেকটা উদাহরণ দিচ্ছিঃ

"জনে জনে সবাই জানে
তোদের যতো কাজকারবার,
আমার কাছে আছেও প্রমাণ
কোথায় করিস দেনদরবার!"

ভাবছেন, এটাতে তো খুব সহজ বুঝা যায়। ৪+৪/৪+৩ মাত্রায় লেখা।

জনে জনে (৪) সবাই জানে(৪)
তোদের যতো (৪) কাজকারবার(৩),
আমার কাছে(৪) আছেও প্রমাণ(৪)
কোথায় করিস(৪) দেনদরবার!(৩)"

তবে সত্যি বলতে এটি ৪+৪/৪+৪ মাত্রায় লেখা। "দেনদরবার" ও "কাজকারবার" তিন মাত্রার হলেও স্বরবৃত্তে এগুলো কে চার মাত্রায় গোনা হয়। কেন! তাহলে মুক্তক্ষর ও বদ্ধাক্ষর টা আসলে কি, সেটাই আগে জেনে নিই।

মুক্তাক্ষরঃ যে অক্ষর উচ্চারনে বাতাস বাধাপ্রাপ্ত হয়না বা শ্বাসরুদ্ধ হয়না তাকে মুক্তাক্ষর বলে। যে অক্ষর কে আপনি টেনে পড়তে পারবেন, সেটাই মুক্তাক্ষর। যেমন- বা+বা, মা, ছে+লে, মে+য়ে ইত্যাদি।    "বা" কে আপনি টেনে পড়তে পারবেন অনেকক্ষণ! সত্যি বলতে এক বর্ণের প্রতিটা উচ্চারণই এক একটা মুক্তাক্ষর।

বদ্ধাক্ষরঃ যে অক্ষর উচ্চারনে বাতাস বাধাপ্রাপ্ত হয় বা শ্বাসরুদ্ধ হয় তাকে বদ্ধাক্ষর বলে। সহজ করে বললে, যে অক্ষর টেনে পড়া যায় না তাকে বদ্ধাক্ষর বলে। যেমন- ভাই, বোন, তাই, পাই, যায়, যাই ইত্যাদি। তবে বদ্ধাক্ষর কিন্তু দুয়ের অধিক বর্ণ নিয়েও হতে পারে। যেমন- "বেহেশত" এর "বে" একটি মুক্তাক্ষর হলেও এর "হেশত্" একটি তিন বর্ণের বদ্ধাক্ষর। একই ভাবে হামদ্, শ্লোক, দোস্ত,  ক্যাম্প, ব্যান্ড ইত্যাদি।
অর্থাৎ, আমরা বলতে পারি দুই বা ততোধিক বর্ণ নিয়ে যে অক্ষর তাকে বদ্ধাক্ষর বলে।

এবার আসুন, কবিতার সেই "দেনদরবার" ও "কাজকারবার" শব্দ গুলো দেখি। এগুলোর প্রত্যেকটিতে (দেন+দর+বার, কাজ+কার+বার) ৩টি করে বদ্ধাক্ষর রয়েছে। এই শব্দ গুলি উচ্চারণ করতে যেহেতু ৪ মাত্রার সমান সময় নেয় তাই স্বরবৃত্তে এগুলো ৪ মাত্রাই ধরা হয়। এটাই হলো মূল কারণ। যদি বুঝতে পেরে থাকেন তাহলে নিচের লাইন গুলোয় দেখুন তো কিছু খুঁজে পান কিনা?

"চুরুটে টান অশ্লীল গান
দৈনন্দিন আড্ডা বাজি,
খোঁজ নেই না! সবটা জানি
কানটা মলবো দুষ্ট পাজি।"

হ্যাঁ, এখানেও "অশ্লীল গান" (অশ+লীল+গান) ও দৈনন্দিন (দৈন+নন+দিন) শব্দ গুলোয় পরপর তিনটি বদ্ধাক্ষর থাকায় এগুলোকে ৪ মাত্রায় গোনা হয়। একই ভাবে, কবিতায় গুনগুনগুন, ঝনঝনঝন তিন মাত্রার হলেও তা চার মাত্রার ধরা হয়।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরপর দুটি বদ্ধাক্ষর ও একটি মুক্তাক্ষর থাকলেও তাকে ৪ মাত্রায় ধরা হয় (যদি সেটি উচ্চারণের জন্য চার মাত্রার সমান সময় লাগে)।

তবে কোন ভাবেই প্রথমে মুক্তাক্ষর ও পরে পরপর দুটি বদ্ধাক্ষর থাকলে সেটি কিন্তু চার মাত্রার হবে না। যেমন -আবিষ্কার (আ+বিষ্+কার), পরিষ্কার (প+রিশ্+কার্) পরিশ্রম (প+রিশ্+রম্), অহংকার (অ+হং+কার) ইত্যাদি।

"দল কানা এক(৪) আহাম্মক ঐ(৪)
ভালোবাসে(৪) দল,(১)
দলের মাঝেই(৪) খুঁজে বাঁচার(৪)
অর্থ বিত্ত(৪) ছল।(১)"

এখানে "আহাম্মক" শব্দ টায় দুটো বদ্ধাক্ষর (আ+হাম্+মক্) থাকলেও তা কিন্তু চার মাত্রায় হয়নি।

এবার চলুন একটু অন্যরকম একটা কবিতা পড়ি। নিচের কয়েকটি চরন পাঠ করুন।

"ওহে লোভী (৪)/আদম মানব(৪)/
তোমার কি শখ(৪)/হয়নি পূরণ?(৪)/
নাই নাই বলে (৪)/একতলা ঘর(৪)/চোখের সামনে(৪)
ক'দিনেই যে(৪)/করলে দ্বিতল,(৪)/
কিনলে আরো(৪)/ধানি জায়গা(৪)/ অল্প অল্প(৪) কয়েক শতক,(৪)/
ভরেনি মন?(৪)/
হয়নি পূরন(৪)/ মনের বাঞ্ছা?(৪)/"

প্রথম ও দ্বিতীয় লাইনে চার মাত্রার ছন্দ থাকলেও লাইন গুলোতেও পর্ব সংখ্যা সমান নয়। তাই এটি কে মুক্তক ছন্দের কবিতা বলে। মুক্তক মানে যেমন ইচ্ছে তেমন লেখা নয়। মুক্ত মানে পর্ব সংখ্যা মুক্ত। মানে পর্ব সংখ্যা সমান নাও হতে পারে।

একটা বিষয় কি লক্ষ্য করেছেন? স্বরবৃত্তের কবিতা সমূহ পাঠ করতে একটু দ্রুতই পাঠ করা লাগে। মানে ধীরগতির কবিতা আসলে স্বরবৃত্ত নয়।

উপরের আলোচনা থেকে আমরা তাহলে কি কি জানলাম?
১. স্বরবৃত্ত ছন্দ কি?
২. পর্ব কি?
৩. অক্ষর কি? অক্ষর কত প্রকার ও কি কি?
৪. মাত্রা নির্ণয়ে স্বরবৃত্তের ব্যতিক্রম গুলো কি কি?
৫. মুক্তক ছন্দ কি?

আশাকরি, এবার স্বরবৃত্তের কবিতা পড়ে কিছুটা হলেও আনন্দ অনুভুত হবে।

(আলোচনার কড়া সমালোচনা আশা করছি সবার কাছ থেকে।)
-০-