আফগানিস্থানের কবিতা (তৃতীয় পর্ব)
শংকর ব্রহ্ম


(তৃতীয় পর্ব)


               দারী কবিতায় আধুনিকতার সূত্রপাত হয় মূলত ষাটের দশকের প্রথম দিকে পাশের দেশ ইরানে ফার্সি কবিতার বিবর্তনের প্রভাবে। ইরানে ‘ফ্রি স্টাইল পোয়েট্রি’ বা মুক্তক ঘরানার কবিতার প্রচলনের সাথে মহিলা কবিদের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
        
              এক্ষেত্রে মুক্তক ঘরানাকে ধ্রুপদী কাব্য প্রকরণের দৃঢ় রীতিকলা ভেঙ্গে ভিন্ন একটি ভাবনা-প্রধান কাব্যশৈলী নির্মানের উদ্যোগ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। ইরানের যশস্বী মহিলা কবি নিমা ইউশিজ-কে (১৮৯৭-১৯৫৬) মুক্তক কাব্যশৈলীর পায়োনিয়ার বিবেচনা করা হয়ে থাকে।
         তাঁর নাম থেকে মুক্তক কাব্যশৈলী ‘নিমায়ী’ কবিতা হিসাবে ইরান ও আফগানিস্তানে পরিচিত হয়ে ওঠে।
       আফগানিস্তানেও ‘নিমায়ী’ কাব্যশৈলী বলতে ধ্রুপদী কাব্যকলার বন্ধনমুক্ত হাল জামানার আধুনিক ভাবনা বিষয়ক কবিতাকে বোঝানো হয়ে থাকে।


                    যশস্বী ইরানি কবি নিমা ইউশিজ (১৮৯৭-১৯৬০) এই ধারার পথিকৃৎ।
ফলে তাঁর নাম থেকেই মুক্তক কাব্যশৈলী ‘নিমায়ি’ কবিতা হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে ইরান ও আফগানিস্তানে। আফগানিস্তানেও নিমায়ি কাব্যশৈলী বলতে ধ্রুপদি কাব্যকলার বন্ধনমুক্ত সাম্প্রতিক কালের আধুনিক ভাবনা বিষয়ক কবিতাকে বোঝানো হয়। এখানে এই নিমায়ি রীতি বিকশিত হয় গত শতকের ষাটের দশকে। যুদ্ধজনিত কারণে সত্তর দশক থেকে প্রবাসের শরণার্থী শিবিরে বাস করে পরবর্তী জীবনে পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশে অভিবাসী হওয়া আফগান কবিরা নিমায়ি শৈলীতে রচিত আধুনিক কাব্যধারাকে সমৃদ্ধ করতে শুরু করেন। তাঁদের রচনায় বিষয়রূপে আসে দিনযাপনের অনিশ্চয়তা, প্রণয়ের অন্তরঙ্গ অনুভূতি এবং ক্ষেত্রবিশেষে প্রতীকীভাবে রাজনৈতিক জীবনের হিউমার। নমুনা হিসেবে কয়েকটি দারি কবিতার অনুবাদ।


পারতাও নাদেরি
-------------------------
জন্ম ১৯৫৩ সালে আফগানিস্তানের বাদাখশান প্রদেশে। কাবুল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক। গত শতাব্দীর সাতের দশকের শুরুতে কবিতায় সোভিয়েতবিরোধী মতাদর্শের জন্য তিন বছর কারাগারে অন্তরীণ ছিলেন। আফগানিস্তানের আধুনিক কবিসম্প্রদায়ের পুরোধা এই কবি বর্তমানে আফগান লেখকদের সংগঠন পেন  চ্যাপ্টারের দায়িত্ব পালন করছেন।


পারতাও নাদেরি-র কবিতা
এখনো সময় আছে বাকি
---------------------------------


এখন মাঝরাত
আমার উচিত মোনাজাতে রুজু হওয়া
কুয়াশার চাদরে ঢাকা প্রপাত
তাকাই আমার সততার আরশির দিকে
ধুলোর ধূসর প্রলেপে তা ছাওয়া।


জেগে ওঠা উচিত আমার
এখনো সময় আছে বাকি
বুঝতে পারি জলের সোরাহির সাথে পানপাত্রের ব্যবধান
নিবিড় কাকলিতে মাতে কটি রাজজাগা পাখি
কোলাহল থেকে বিযুক্ত হয় সংগীতের তান।


সময়ের রথচক্র ঘড়ঘড়িয়ে নেমে যাচ্ছে বয়সের ঢালে
জানি না কখন এসে লাগবে ওপারের বাতাস আমার পালে।
আগামীকাল বিষাক্ত তীরে হয়তো বিদ্ধ হবে আমার দু-চোখ
দেখো চিত্রিত পাখি দুটি ডানা ঝাপটে উড়ানে হয়েছে উন্মুখ।
হয়তো আগামীকাল আমার সন্তান হবে বৃদ্ধ—প্রতীক্ষায়
আমার ঘরে ফেরার পথ চেয়ে সে বসে থাকবে—হায়।


রেজা মোহাম্মাদি
------------------------
জন্ম ১৯৭৯ সালে আফগানিস্তানের কান্দাহারে। লন্ডনের মেট্রোপলিটান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর অর্জন করেছেন বিশ্বায়নের ওপর। ১৯৯৬-এ রেজা মোহাম্মাদি ইরানের ‘শ্রেষ্ঠ তরুণ কবি’ পদকে ভূষিত হন তিনি। পেশায় সাংবাদিক এই কবি সাংস্কৃতিক ভাষ্যকার হিসেবেও পরিচিত।


রেজা মোহাম্মাদি-র কবিতা
হাওয়া
------------------


যদি বা বাতাস পরে নেয় সুচারু পরিচ্ছদ
দু-পায়ে চামড়ার ফিতে আঁটা জুতা
রজনীর মধ্যযামে
আমার বাড়ির ভেতর দিয়ে বয়ে যেতে যেতে
একবাটি পেঁয়াজের সুরুয়া নিয়ে থামে।


সে চুমো খায় আমার মুখে
যখন আমি ইয়ার বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় মশগুল
রাজন্যকে বিদ্রূপ করে আবৃত্তি করি পদাবলি
রাজনীতির মাইফেলে আমি কবি এক উন্মূল।


সে আদতে অদৃশ্য
তাই কেউ দেখতে পায় না তাকে
আমি তাকে অনুসরণ করি
হেঁটে যাই সরণির বাঁকে।


আমার দিনযাপনের পল্লবে হাওয়া বয় ঢের
অনেক বছর ধরে আমি প্রণয়-কাতর বাতাসের।


শাকিলা আজিজজাদা
--------------------------------
জন্ম ১৯৬৪ সালে আফগানিস্তানের কাবুলে। বর্তমানে প্রবাসী এই কবি নেদারল্যান্ডের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাচ্যের ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। ব্যক্তিগত বাসনার অন্তরঙ্গ স্বর প্রতিভাত হয় তাঁর কবিতায়। কবিতা ছাড়াও তিনি রচনা করেছেন নাটক। মঞ্চে কবিতার উপস্থাপনায় তাঁর দক্ষতাও প্রশংসিত হয়েছে।


শাকিলা আজিজজাদা-র কবিতা
অভিসার
-----------------


                  হয়ে তো গেল অনেক বছর
তারপর ঝরেছে চেনারের পত্রালি ঢের
বলতে পারি না ‘শুভকামনা’ দেখা হবে ফের
যেহেতু আমরা ক্রমাগত হচ্ছি প্রবীণ
আমাদের দেখা হবে নিশ্চিত
            কেবলমাত্র রোজ কেয়ামতের দিন।


আমি জানি তোমার উপস্থিতিতে
প্রফুল্ল হবে আমার শরীর মন
তুমি বলতে রেশমের কালো মোজাদু'টি
আমার দু-পায়ে দেখাত সুদর্শন।


যদি একবার আমি দেখতে পেতাম
তোমার চাহনি শরমে শিহরিত
কাঁপা কাঁপা চোখজোড়া আমার
ফিতার ফুল ছুঁয়ে হচ্ছে উদ্দীপিত।


ধরবে বাজি—আমি যদি বলি নদী
তুমি হতে চাও নাকি মাছ
বয়ে যায় আমাদের প্রেরণার জলধি।


তোমার সাথে দেখা হবে ফের প্রস্রবণের পাশে
তোমার হাতে থাকবে একটি গোলাপ সংগোপনে
স্বপ্ন আমার ভাঙচুর হবে মৌমাছির গুঞ্জরণে
আর প্রত্যাশায় আমি হবো কেঁপে থর থর আনত
পুষ্পের ভারে ডালিমের ডালটির মতো।


       আফগানিস্তানে ‘নিমায়ী’-রীতি বিকশিত হতে থাকে ষাটের দশক থেকে। এবং সে আমলের কবিদের ‘নিমায়ী’ ধরার ‘ফার্স্ট ওয়েভ’ বা ‘প্রথম তরঙ্গ’ বলা হয়।
       সত্তর দশকের দারী ভাষার কবিরা ‘নিমায়ী’ ধারার ‘সেকেন্ড ওয়েভ’ বা ‘দ্বিতীয় তরঙ্গে’র কবি হিসাবে পরিচিত।
       নব্বই দশক থেকে আজ আব্দি কবিদের অনেকেই ‘নিমায়ী’ ধারার ‘থার্ড ওয়েভ’ বা ‘তৃতীয় তরঙ্গে’র ধারক হিসাবে নিজেদের পরিচয় দিতে ভালোবাসেন। এখানে অনূদিত কবি তিনজনকে যথাক্রমে ষাট, সত্তর ও আশির দশক থেকে নির্বাচন করা হয়েছে।


ওয়াসেফ বাখতারী
---------------------------
          যশস্বী কবি বাখতারী’র জন্ম ১৯৪২ সালে, শৈশবে বেড়ে ওঠেন প্রান্তিক শহর মাঝার শরীফে। উচ্চমাধ্যমিক স্তর থেকে পড়াশোনা মূলত কাবুলে। যুক্তরাষ্ট্রের কলোম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন। ছিলেন কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্যের অধ্যাপক। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অনুবাদকেরও কাজ করেন কয়েক বছর। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী। পঞ্চাশের দশকে লেখালেখির সূত্রপাত হলেও পাদপ্রদীপের আলোয় আসেন ছ’য়ের দশকে। তিনি ‘নিমায়ী’ কাব্যধারার প্রথম তরঙ্গের পথিকৃত কবিদের অন্যতম।


অগ্নিরোগ | ওয়াসেফ বাখতারী
___________________________________                      


আনারের রক্তাক্ত দানার মতো
লোহিত হরফ দিয়ে লেখা
আমার ভাগ্যের হালখাতা
তার ছিদ্রময় প্রতিটি পাতা,
জলন্ত অঙ্গার হয়ে যেন
                    পুড়ছে আমার হৃদয়
যারা স্পর্শ  করে এ বিধিলিপি অগ্নিময়—
এবং দিতে চায় সজল ত্রাণ
পুড়ে ভষ্ম হয় তাদের প্রাণ;
এ দুর্যোগ—
লোহিত এ অগ্নিরোগ
কুরে কুরে খায় আমাদের
সমুদয় আনন্দ উপভোগ।


আব্দুল সামী হামিদ
---------------------------
চিকিৎসা বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করলেও কবি সামী হামিদ পেশায় মূলত সাংবাদিক। তবে রাজনৈতিক কার্টুন আঁকিয়ে হিসাবেও তিনি যশস্বী। ‘এসোসিয়েশন ফর দি ডিফেন্স অব আফগান রাইটারস রাইটস’-এর তিনি যুগ্ম-প্রতিষ্ঠাতা। এক সময় সম্পাদনা করতেন আন্ডারগ্রাউন্ড সংবাদপত্র ‘সালাম’।
২০০৩ সালে ‘কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট’ বা ‘সিপিজে’ তাঁকে ‘ইন্টারন্যাশনাল প্রেস ফ্রিডম’  নামক পুরস্কারে সম্মানিত করে।
     ওই একই সালে তিনি আততায়ীর ছুরিকাঘাতে মারাত্মকভাবে জখম হলে জনসমক্ষে আসা বন্ধ করে দেন। লেখালেখির সূত্রপাত ষাটের দশকের শেষ দিকে হলেও জনপ্রিয় হন সত্তর দশকে। তাঁর বইপত্র প্রকাশিত হতে থাকে আশির দশক থেকে। তিনি ‘নিমায়ী’ কাব্যধারার দ্বিতীয় তরঙ্গের কবি হিসাবে বিবেচিত।
___________________________________


এক হাজার এবং দ্বিতীয় রাত | আব্দুল সামী হামিদ
___________________________________


ঠিক জানি না সহ্য-ক্ষমতা কতটুকু আমার উদ্‌ভ্রান্ত হৃদয়ের
ধংসস্তূপের লোহিত পুষ্পটি বাঁচবে কি না সন্দেহ আছে ঢের,
বসন্তের স্বর্গীয় দূত যে কৃষ্ণ খেচর—বাঁধবে কি সে নীড়
নেই তো কবোষ্ণ দেয়ালগিরি কোনো— বইবে না সিগ্ধ সমীর।


আছে হয়তো দেয়ালে গর্তের নোনাধরা সংকীর্ণ বিস্তার
তাতে জায়গা হবে কি নীড়ের শুকনো পাতা খড়-কুটার?
ফোঁটায় ফোঁটায় তপ্ত মোমের মতো গলে নিয়তি আমার
শিখা-প্রিয় সুদর্শন মথ কি জেনে যাবে বিষয়টা এবার?


হাজার রজনী অতিক্রম করে আসবে যখন দোসরা রাত
মহিমান্বিত হবে কি কিংবদন্তীর শাহেরজাদের বরাত?



মোহাম্মদ করিম নাজিহি জিলওয়া
-----------------------------------------------
সাম্প্রতিক কালের জনপ্রিয় কবি জিলওয়া’র জীবনের অনেকগুলো বছর কেটেছে  পাকিস্তান ও ইরানের শরণার্থী শিবিরে। আশির দশকে তাঁর লেখালেখির সূত্রপাত হয় পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে হাতে লেখা পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে। নব্বই দশক থেকে তাঁর রচনা প্রকাশিত হতে থাকে কাবুলের পত্র-পত্রিকায়। বর্তমানে কবি কাবুল শহরে বাস করেন। তাঁকে ‘নিমায়ী’ কাব্যধারার তৃতীয় তরঙ্গের কবি বিবেচনা করা হয়ে থাকে।
___________________________________


হৃদয়ের বেদনার বিষয় | মোহাম্মদ করিম নাজিহি জিলওয়া
___________________________________


সে ছাড়া কেউ তো জানে না আমার হৃদয়ের দগদগে জখম
বাড়িওয়ালা ছাড়া আর কেই-বা খবর রাখে
ঘরের নকশা খুঁটিনাটি—গালিচা..আসবাবপত্র কত রকম
দেখেছে কা'রা তার নির্মমতার নজির
যা ডেকে আনে ধ্বংস বিষাদ অবশেষে সমূহ বিনাশ
জলন্ত চুলা ছাড়া অন্য কেউ কি বুঝতে পারে
আগুন ছড়াতে পারে কতোটা সন্ত্রাস?


যখন লিপ্ত হতে চাই তার সাথে ঝগড়া বিবাদ দ্বন্দ্বে
ভালোবাসার চোরাস্রোতে নিমজ্জিত হই—
মুগ্ধ হই আমি কোঁকড়ানো চুলের মৃদু ছন্দে


সরল পাখি জানবে কি ভাবে
কতোটা তফাত বার্ডফিডার আর ফাঁদে
জড়াই কিভাবে দেহজ প্রলোভনে—
কিসের টানে
উঠে যাই যশের অভ্রভেদী ছাদে


বিজ্ঞজনের প্রাজ্ঞমনে আমার কামনা কুহেলী
আদতে বাকচাতুরী শিশুতোষ ছল
প্রতিফলিত হয় তার নেশাতুর চোখে
দুই ভুবনের কোলাহল।


যদিবা কখনো বন্ধ হয় স্বর্গের দুয়ার
কী হবে জুলুমের যজ্ঞে পুড়িয়ে তাজা দেহ-মন
স্বর্গ মোসাফির এক জেনো
তোমার ভেতরেও আছে নিজস্ব ভুবন।