আফগানিস্থানের কবিতা (দ্বিতীয় পর্ব)
শংকর ব্রহ্ম


(দ্বিতীয় পর্ব)
  
         ‘পীর মোহম্মদ কারবাঁ’,  মধ্য চল্লিশের কবি ‘খোস্ত’-এ জন্মগ্রহণ করেন। তালিবান শাসনের সময় ১৯৯০ সালে তিনি পাকিস্তানের পেশোয়ারে আশ্রয় নেন। এক দশক সেখানে কাটিয়ে তালিবানি শাসন শেষ হলে তিনি কাবুলে ফিরে আসেন।
    ‘কারবাঁ’র প্রকাশিত বই তিনটি।
‘কারবাঁ’ ইঙ্গিতময় কবিতায় পারদর্শী। মুখের ভাষাকে মোচড় দিয়ে কবিতায় নিয়ে যান ‘কারবাঁ’।
‘পীর মোহম্মদ কারবাঁ’র একটি কবিতার ভাবানুবাদ -

ফুল এবং মানুষ
……………….


ফুল, মাটি আর ছাই নেয়
কিছু পরিষ্কার বাকিটা ময়লা জলও নেয়
আর পবিত্র থাকে
সুন্দর আর সুরভিত থাকে
ফুলের রং আমাদের চোখে আরাম দেয়
হৃদয়ে দেয় শুশ্রূষা

মানুষ যার কাছে একদিন দেবদূতও মাথা নত করেছিল
সেই সব মানুষেরা ফুল দেখে
চোখের জলের চেয়েও পরিষ্কার জল পান করে
গভীর লাল আপেলে দাঁত বসায় তারা
কুৎসিত হতে থাকে,
কেন হতে থাকে, কেন?


     এখানে এবার দিলাম সেই পঁচিশ বছরের মেয়েটির কবিতাটা, (যেটা না দিলেই নয়) , যাকে কবিতা লেখা এবং কবিতার বই প্রকাশ করার অপরাধে তার স্বামী মেরে মেরে রক্ত বমি করিয়ে নৃশংস ভাবে মেরে ফেলেছিলেন।
         নাম তার নাদিয়া আঞ্জুমান(১৯৮০-২০০৫). আফগানিস্তানের হেরাটের মেয়ে নাদিয়া ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ছিল। সাহিত্যের প্রতি ছিল তীব্র আকর্ষণ। বিশেষত কবিতার প্রতি। ১৯৯৬ সালে আফগানিস্তানের দখল নেয় তালিবানরা। মেয়েদের সমস্ত স্কুল বন্ধ করে দেয়া হয়। শুধু তাই নয় তাদের ঘরের বাইরে পা রাখাও কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়। ব্যতিক্রমের আওতায় ছিল সেলাই শেখার স্কুল।
নাদিয়া ভর্তি হয়ে যায় এমন একটি সেলাই-স্কুলে। যার নাম ছিল, ‘Golden Needle Sewing School’.
       এই স্কুলটিতে সেলাই-এর ক্লাস নেয়া হলেও গোপনে সাহিত্যের আলোচনা হতো।
হেরাট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক 'মহঃ আলি রেহাব' এই আলোচনা করতেন। নাদিয়া তাঁর মাধ্যমেই ‘হাফিজ সিরাজ’, 'বিদেল দেলহেভি’, ‘ফারা ফারোকজদের’ কবিতার সঙ্গে পরিচিত হয় এবং নিজেও লিখতে থাকে, গোপনে।
এই স্কুলের বাইরে খেলায় ব্যস্ত ছেলেপুলেদের কাজ ছিল ধর্মীয় পুলিশদের দেখা পেলেই সাংকেতিক ভাষায় সজাগ করে দেওয়া।
দীর্ঘ পাঁচ বছর এই ভাবে সাহিত্যপাঠ নেওয়ার পরে ২০০১ সালে তালিবানদের পতন হয়।
একুশ বছর বয়সে নাদিয়া ‘হেরাট বিশ্ববিদ্যালয়ে’ ভর্তি হয়। ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে সেখান থেকে। ইতিমধ্যে অধ্যাপক রেহাবের উৎসাহ এবং সাহায্যে নাদিয়ার কবিতার বই ‘গুল-এ-দোদি’ ( ধোঁয়াচ্ছন্ন ফুল) প্রকাশিত হয়। বইটি শুধু আফগানিস্তানে নয়, ইরান এবং পাকিস্তানেও পাঠকদের কাছ জনপ্রিয়তা পায়। নাদিয়ার নাম দেশের সীমার বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। এই সময়েই নাদিয়ার সঙ্গে ফরিদ আহমেদ মজিদ নেইয়া’র বিয়ে হয়ে যায়। সাহিত্যে স্নাতক, লাইব্রেরিয়ান মজিদ নেইয়া কিন্তু নাদিয়ার কবিতা-প্রেম নিতে পারেনি। সে এবং তার পরিবার ধর্মের নামে তার কবিতা লেখার বিরোধিতা করতে থাকে। অদ্ভুত ব্যাপার, তাই না? সব জায়গাতেই মহিলারা ধর্মের নামে নিপীড়ত হতে হয়। মহিলাদের জন্য অনেকগুলো ‘না’ পুরুষশাসিত সমাজে ধর্ম এবং রাজনীতি নামে নির্দিষ্ট করে দেয়, কোনও ধর্মই তার ব্যতিক্রম নয়।
            তুমুল লড়াই, আত্মবলিদানের মাধ্যমে মহিলারা শিক্ষা থেকে ভোট, চাকরি থেকে খেলাধুলো করার অধিকার পেয়েছেন আজ।
           'সতীদাহ প্রথা' সময়ের নিরিখে খুব একটা পুরনো ঘটনা নয় কিন্তু ।
যাই হোক, নাদিয়া ঠিক করে যে সে তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘এক শবদ দিলহোরে’ ( অফুরন্ত ভয়) প্রকাশ করবে। বইটিতে তার বিবাহিত জীবনের ব্যর্থতাজনিত বিষাদের ছায়া ছিল। স্বামী মাজিদ নেইয়া ও তার পরিবারের সক্রিয় বিরোধিতা সত্ত্বেও নাদিয়া বই প্রকাশের সিদ্ধান্তে অটল থাকে। অশান্তি বেড়ে চলে দিনের পর দিন।
নাদিয়া তাতেও তার বই প্রকাশ করা থেকে পিছু হটেননি।
            ২০০৫ সালের ‘ইদ-উল-ফিতর’-এর দিন আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করা নিয়ে মাজিদের সঙ্গে নাদিয়ার বাদানুবাদ হয়। কবিতা লেখার জন্য আগে থেকেই ক্ষিপ্ত মাজিদ নাদিয়াকে মারতে শুরু করে। মারতে মারতে মেরে ফেলে নাদিয়াকে। মারের চোটে নাদিয়া শেষ নিশ্বাস ফেলার আগে রক্ত বমি করে। মাজিদ পরে এই ঘটনাকে বিষক্রিয়া হিসেবে চালায় এবং বলে যে নাদিয়া আত্মহত্যা করেছে। মাত্র এক মাস জেল খেটে সে বেরিয়ে আসে। নাদিয়া মাত্র ২৫ বছর বেঁচেছিল। এই স্বল্প জীবনেই সে স্মরণযোগ্য বেশ কিছু কবিতা তার পাঠকদের জন্য লিখে রেখে গেছে। নাদিয়ার একটি কবিতা পড়া যাক, ভাবানুবাদে -

গজল
-----------------

সুরা চাই তার সুন্দর থেকে, তৃপ্ততা চাই
আমি তার অগ্নিপ্রবণ প্রেমের শিখায় পুড়তে পুড়তে
রানি হতে চাই হৃদয়ের
আমি হতে চাই শুধু একফোঁটা জল সুন্দর দুটি চোখের
সে তো ফুলই,
সেই ফুললিত মুখে হতে চাই আমি কোঁকড়া চুলের সৌরভ
অথবা তার চলার পথেই ধুলো যদি হতে পারতাম

তীব্র গরমে গলতে গলতে আমি যদি হয়ে উঠতাম
গোপন পংক্তি,
বিরল শব্দ ওর দু'ঠোঁটের সান্নিধ্যে তার শ্বাসের ছায়া
তারই পায়ে পায়ে হায় যদি হতে পারতাম
আর থাকতাম যদি তার সঙ্গে এভাবে, এমনিই সারাদিন
আমি বোঝাতে পারতাম এই বিচ্ছেদে তবে নিজেকেই
যে, আমি আমার মনের দরজা বন্ধ করেই দিচ্ছি
আমি হয়ে যাচ্ছি মাথা থেকে পা চাঁদের আলো ক্রমশ।
  
           নিষিদ্ধ কবিতার আসরে (১৮ই ফেব্রুয়ারী,২০১৬ সালে) প্রেমের কবিতা পড়েছিলেন নাদিয়া


‘প্রিয়তম বিহনে সারা রাত পুড়ি আর জ্বলি
আমি এক মোমের বাতি, নীরবেই পুড়ি আর গলি’


        আফগানিস্তানের কান্দাহার শহরের একটি গোপন কবিতা পাঠের আসরে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে পশতু ভাষায় নিজের লেখা এই 'লান্দে' পড়ছিলেন কুড়ি বছর বয়সী বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্রী নাদিয়া।
        ঐতিহ্যবাহী পশতুন লোককাব্যের অনন্য এক ঘরানার নাম ‘লান্দে’। 'লান্দে' হচ্ছে প্রেম-বিষয়ক দুই লাইনে লেখা বিশেষ ঘরানার অণুকাব্য— পশতুন ভাষায় ‘লান্দে’ শব্দের মানে হলো ‘ছোট বিষধর সাপ’।
           সাধারণতঃ এই কাব্যের বিষয়বস্তু নারী ও পুরুষের শাশ্বত প্রেম।  'লান্দে' হচ্ছে প্রেম-বিষয়ক দুই লাইনে লেখা বিশেষ ঘরানার অণুকাব্য। এই অণুকাব্য ২২ মাত্রায় লেখা হয়। প্রথম লাইনে ৯ মাত্রা। দ্বিতীয় লাইনে ১৩ মাত্রা। এতে অন্তমিল দেওয়া, না-দেওয়া কবির ইচ্ছাধীন।


       ওই কবিতা পাঠের আসরে উপস্থিত ছিলেন হাতে গোনা কয়েকজন নারী কবি। তাঁরা এমন এক ‘নিষিদ্ধ’ বিষয় নিয়ে লেখা স্বরচিত কবিতা পাঠ করছিলেন, যার খবর তালেবানের কানে গেলে তাঁরা খুনও হয়ে যেতে পারতেন। এই ‘নিষিদ্ধ’ বিষয়টির নাম ‘প্রেম’!
          
             রাজধানী কাবুলে বেশ আয়োজন করে প্রকাশ্যে এই কবিতা পাঠের আসর বসানো হয়। তবে তালেবান-অধ্যুষিত কান্দাহার বা হেলমান্দ প্রদেশে এ ধরণের কাব্যের আসর এখনও ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে নারীদের জন্য এটা ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনতে পারে। তালেবান মনে করে, এ ধরণের কাব্যচর্চা নারী-পুরুষের অবাধ মেলা-মেশাকে উৎসাহিত করে।
           তবে সব ঝুঁকি ও ভয় উপেক্ষা করে আফগানিস্তানের নারী কবিরা ‘মিরমান বাহির’ নামের একটি সাহিত্য সংগঠন করেছেন।
      এই সংগঠনের উদ্যোগে বিভিন্ন জায়গায় নারী কবিরা প্রতি সপ্তাহে গোপন সাহিত্য বাসরে মিলিত হন। যাঁরা ভয়ে আসতে পারেন না, তাঁদের জন্য টেলিফোনের হটলাইন আছে। তাঁরা ফোন করে কবিতা পড়ে শোনান।
      শুধু তালেবান নয়, কান্দাহার বা হেলমান্দের সমাজও সাধারণভাবে নারীদের এ প্রেমের কবিতাচর্চাকে বাঁকা চোখে দেখে।
    নাদিয়া জানান, মা তাঁকে এই সাহিত্য সংগঠনে যোগ দিতে নিষেধ করেছেন। নাদিয়া বলেন,
‘মা বলেছেন, “প্রেমের কবিতা লেখে যে মেয়ে তাকে বিয়ে করবেটা কে?”’
      তবে এই মিরমান বাহির-এর মাধ্যমে পশতুন নারীদের মুক্তির স্বপ্ন দেখিয়েছেন নাদিয়া।
    'আই অ্যাম এ বেগার অব দ্য ওয়ার্ল্ড : লান্দেজ ফ্রম কনটেমপোরারি আফগানিস্তান'- বইয়ের লেখিকা এলিজা গ্রিসওল্ড এএফপিকে বলেন, ‘নীল বোরকার আড়ালে চুপ মেরে থাকা মৃতবৎ পশতুন নারীদের সম্পর্কে যে ধারণা প্রচলিত আছে, লান্দে তার গ্লানি, প্রেম ও ক্ষোভের শক্তি দিয়ে সেই ধারণার বিরুদ্ধে এক সুপ্ত লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।’
       মার্কিন জোটের অভিযানে কুড়ি বছর আগে কট্টরপন্থী তালেবানের পতন হওয়ার পরও আফগানিস্তানের অধিকাংশ জায়গায়ই নারীদের অবরুদ্ধ করে রাখা হচ্ছে।
    মিরান বাহির-এর সমন্বয়ক পাকিজা আরজু বলেন, ২০১০ সালে হেলমান্দে জারমিনা নামের এক কবি গায়ে আগুন ধরিয়ে আত্মহত্যা করেন। তিনি টেলিফোনে সাপ্তাহিক আসরে লান্দে পড়ে শোনাতেন। জারমিনার ভাই মনে করেছিলেন, তিনি কোনো পুরুষের সঙ্গে প্রেমালাপ করছেন। এই নিয়ে তাঁকে নির্যাতন করা হয়। পরে তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।
  টেলিফোনে নিয়মিত নিজের লেখা পড়ে শোনান এমন একজন কবির একটি লান্দে শোনান পাকিজা আরজু:
‘কার পাপে আমি আজ প্রথার বলি?
আমি শুধু নারী, এ আমার সবচেয়ে বড় অপরাধ?