(নোটঃ কিছু কবিতার জন্ম হয় হঠাৎ করে, তার পেছনে কোন গল্প থাকে না। কিন্তু কিছু কবিতার জন্মের পেছনে একটা গল্প থাকে, কোন একটা বিষাদ থাকে কিংবা দহন। কবিতার পেছনের গল্প গুলো পাঠক জানে না, কবি একাই বহন সেই সব গল্প, সুখের কিংবা বিষাদের)

কবিতা-২ এর পেছনের গল্প

আমি তখন, ইউনিসেফ এর সাথে, রোহিঙ্গা উদবাস্তু জনগোষ্টীর জন্য জরুরী সহায়তা কর্মসূচীতে কাজ করছিলাম ২০১৭-২০১৯ সালে। প্রায় প্রতিদিন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যেতে হতো নানা কাজে। ৩৩টি ক্যাম্পের সবগুলোতেই আমাদের কাজ ছিল। কোন এক জায়গায় দীর্ঘক্ষন বসার সুযোগ ছিল না, ভয়াবহ ব্যস্ততার মধ্যে কাটতো সেই দিনগুলো। ১৯৭১ সালে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়, বাংলাদেশের মানুষওঁ এরকম উদবাস্ত ছিলো ভারতে কিন্তু আমি তো সেটা দেখিনি। বাবা মায়ের মুখে অনেক গল্প শুনেছি, অনেক করুণ গল্পের  ইতিহাস শুনেছি, মানুষের আর্তনাদ আর হাহাকারের চিৎকার শুনেছি কিন্ত এবার নিজের চোখেই দেখলাম উদবাস্ত জীবন কেমন হয়!! ভয়াবহ, অবর্ননীয়, অমানবিক এবং নৃশংস। প্রতিদিনের ক্যাম্প ভিজিট শেষে যখন বাসায় ফিরতাম, এক বুক কান্না আর কষ্ট ঘিরে রাখতো, কাউকে বলতে পারতাম না, আমার কোন ক্ষমতা নেই এর পরিবর্তনের, অক্ষমতার দংশন ছিল সব সময়। ক্যাম্পগুলোতে প্রতিদিন তৈরী হতো হাজারো না জানা গল্প।

একদিন, ক্যাম্প ৩৩ এ ভিজিট করছিলাম, উখিয়া উপজেলা, কক্সবাজার জেলায়। সারাদিন এই কাজ, সেই কাজ করে একটু ফুসরত পেলাম, পাশেই একটা দোকানে একটু বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখতে পেলাম, দূরে, এক পাহাড়ের চূড়ার উপর, একটি রোহিঙ্গা মেয়ে আনমনে বসে আছে। সবাই যখন রিলিফের লাইনে জায়গা পাওয়া নিয়ে অস্থির, রিলিফ নিয়ে ক্যাম্পের ছাউনিতে রান্না করা নিয়ে ব্যস্ত, জঠরের জ্বালা পুরন নিয়ে কম্পিত, ঠিক তখন এক যুবতী কোনদিকে তার ভ্রক্ষেপ নেই, আনমনে তাকিয়ে আছে দূর পানে, যেন বা আর কয়েকটা পাহাড় পাড়ি দিতে পারলেই ফিরে যেতে পারবে নিজ দেশে, নিজ ভূমিতে, মায়ানমারে। তখনো জানতাম না, তার ভেতরে তোলপাড় করা কান্নার গল্প। অনেকক্ষন পর্যবেক্ষন করার পর, মনে হলো কাছে গিয়ে দেখি তার কি সমস্য, রিলিফ পেতে তার কোন ঝামেলা হচ্ছে কি না। তখনো আমার মাথায় ছিল, আমাদের কর্মসূচীর সঠিক বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না সে বিষয়ে। আমার এখানে দায়িত্ব রয়েছে, ভাবনাটা ঘুরছিলো দায়িত্ববোধের জায়গায়।

অবশেষে সেখানে গিয়ে মেয়েটির সাথে কথা বললাম, একজন দোভাষীর মাধ্যমে। বেশ কিছুটা সময় রেপোর্ট বিল্ডিং করতে হলো। শেষে মেয়েটি তার জীবনের পেছনের কথা বললো- এক ছেলের সাথে তার মানুষিক নৈকট্য ছিল, যেটাকে আমরা প্রেম বলি। মেয়ে এবং ছেলে উভয়েই মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান্। ছেলেটি পড়াশুনা খুব বেশি করেনি, একটা গ্রোসারী দোকান ব্যবসা করছিল, মেয়েটি তখনো ছাত্র। সপ্তাহে ছুটির দিনে তাদের দেখা হতো, নাফ নদীর তীর ঘেষে তারা দুজন একে অপরের হাত ধরে হাটতো। দুজনের অভিভাবকরাই বিষয়টি জানতো। তাদের দুজনের বিয়ে নিয়েও কারোর আপত্তি ছিল না, কেবল সময়ের অপেক্ষা ছিল। মেয়েটির লেখাপড়া শেষ হলেই তাদের বিয়ে হবে। তারা একটি ঘর বাধার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল। প্রতি সপ্তাহে তারা নানা রঙের স্বপ্ন বুনতো। অপেক্ষা করতো পরের সপ্তাহের ছুটির দিনের জন্য। এভাবেই কাটছিলো তাদের সময়।

একদিন সেই ভয়াবহ দিনে তাদের সব স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার করে দিলো। মায়ানমার সামরিক জান্তা বাহিনী। হত্যা, অত্যাচার এবং নৃশংস খুনের মাধ্যমে তাদের বাস্তুচ্যুত করে দিলো।মেয়েটী চোখের সামনে দেখেছিল তার প্রেমিকের বুক চিরে দু’ভাগ করে দেয়ার চিত্র, লাশ পুড়িয়ে দেয়ার চিত্রও। কি নৃশংস আর ভয়াবহ ছিল !! চোখের সামনে এমন নৃশংষতা কিছুতেই ভুলতে পারছে না মেয়েটি। ক্ষনে ক্ষনে তার মন বিষাদে ভরে ওঠে। প্রায় ঘন্টা ধরে মেয়েটির পেছনের গল্প শুনে ফিরে গেলাম কক্সবাজার নিজের বাসায়। চোখের সামনে ভাসছিল মেয়েটির মলিন আর ক্ষনে ক্ষনে প্রকম্পিত মুখের ভাজ।

এ ঘটনা থেকেই জন্ম  হলো এই কবিতার

রোহিঙ্গা যুবতীর প্রেম
-সরদার আরিফ উদ্দিন

উদ্বাস্তু রোহিঙ্গার আবার প্রেম কি?
মানুষ যদি হতে পারিস
তবেই প্রেমের কথা বলতে আসিস;
তা নয়তো রিলিফ খেয়েই বেঁচে থাকিস।

নদীর তীর ঘেঁষে একদিন দুজনে হেঁটেছিল
সেই নদী পাড়ি দিয়েই গতমাসে উদ্বাস্তু  হয়েছিল;
রাজনৈতিক খেলোয়াড়দের উল্লাস দেখেছিল
প্রেমিকের দগ্ধ পোড়া লাশ চোখের সামনেই ছিল।

এখন তোর পরিচয় উদ্বাস্তু রোহিঙ্গা
তোর জীবন চলবে ভিক্ষে মাঙ্গিয়া;
রোহিঙ্গা যুবতীর মনে প্রেম থাকতে নেই
আগের প্রেমের দহনে পোড়ার সুযোগও নেই।

প্রেমের শিহরনে মন ভাসছিল
হাতে হাত রেখে ঘর বাধার স্বপ্নে বিভোর ছিল;
চোখের পাপড়িতে আদর মাখানো দিন ছিল
হদয়ের তাপে পোড়ান মুঠো মুঠো সুখ ছিল।

রাজনীতি প্রেমে অজ্ঞ, ক্ষমতায় অন্ধ
রাজনীতিবিদদের প্রেমের মাহাত্ত্য বোঝানো দুঃসাধ্য;
রোহিঙ্গা যুবতীর প্রেমের জল কণা
গতকাল তাকে ক্যাম্পে দেখেছিলাম খুবই আনমনা।

কক্সবাজার
জানুয়ারি ০১, ২০১৮