প্রথমেই বাংলা কবিতা ওয়েবসাইটের সকল এডমিন কবি লেখক পাঠক ও শুভাকাঙ্খীদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি কারন আমার তেমন কোন পুথিগত বিদ্যা নেই বিভিন্ন ধরনের কবিতা নিয় আলোচনা করার তবুও ইতিমধ্যে সনেট এবং আজ রুবাই বা রুবাইয়াৎ নিয়ে লেখা প্রকাশ করলাম ,
মূলত: বিভিন্ন ধরনের কবিতা নিয়ে পড়াশুনা করার সময় যে নোট নিয়েছিলাম তাকে সাজিয়ে উপস্থাপন করছি ,  সবার কাছে অনুরোধ থকলো  কোথাও কোন অসংগতি পেলে অবশ্যই মন্তব্যের পাতায় জানাবেন ।


রুবাই


  বাংলা কবিতার আসরে আমরা অনেকেই রুবাই বা রুবাইয়াৎ লিখে যাচ্ছি কিন্তু রুবাইয়ের জনক ওমর খৈয়াম ও তার উত্তরসূরী কবি হাফিজ যে ভাব গাম্ভির্য ও শব্দশৈলী ব্যবহারে রুবাইকে একটি উচ্চমার্গের কবিতায় পরিণত করে গেছেন আমরা হয়ত রুবাই রচনায় সে  ভাব গাম্ভির্য ও দার্শনিক ভাবধারা তুলে ধরতে পারছিনা তাই আমাদেরকে আরও সচেতনতার সঙ্গে রুবাইয়ের মূলধারার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রুবাই লেখা উচিত ।
‘রুবাই’ শব্দটি মূলত আরবী শব্দ أَرْبَعَة‎ ( আরাবা আ ) থেকে উৎসারিত যার অর্থ চার , ভিন্ন মতে আরবী رُبَاعِيّ‎ ( রুবাইয়া) থেকে রুবাই বা রুবাইয়াৎ নামে ফারসী ভাষায় সংযোজিত হয়, রুবাইয়া (Rubaiya) এর অর্থ নিয়ে মত পার্থক্য দেখা যায়। তবে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য কয়েকটি অর্থ হচ্ছে, “বসন্ত কাল“, “আল্লাহর উপহার” ও “সুন্দরী নারী“। ইরানের বিখ্যাত কবি ওমর খৈয়াম সুন্দরী নারীর সাথে তুলনা করে তার চারলাইনের কবিতাগুলোকে রুবাই নামকরন করেন । রুবাই ফারসী ভাষায় যা এক বচন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ‘রুবাইয়াৎ’ হচ্ছে বহুবচন। রুবাইয়াৎ কাব্যের উত্থান ঘটেছে ওমর খৈয়ামের হাত ধরে। কথিত আছে ওমর খৈয়ামের দুই প্রেমিকা রুবাই ও রুবাইয়াৎ কে উদ্দেশ্য করেই কবি প্রথমে এ ধরনের কবিতা রচনা করেন, যে কারনে তিনি তার চারলাইনর লেখা কবিতাকে রুবাই বা রুবায়াৎ নামে অভিহিত করেন ।
  রুবাই হচ্ছে মূলত চতুষ্পদী কবিতা, চার চরণের মধ্যে একটিমাত্র ভাবকে হৃদয়গ্রাহী করে উপস্থাপন করা।  প্রেম, দ্রোহ, আনন্দ, বিষাদ, মানব হৃদয়ের আশা, আকাক্সক্ষার প্রতিফলনের চিত্র অঙ্কিত হয় রুবাইয়াতের ছত্রে ছত্রে। আশাবাদ, নৈরাশ্যবাদ, সুফিবাদ, মরমিবাদ, দেহবাদ, নিয়তিবাদ এবং দর্শন তত্ত্বের উদ্ভব ঘটে রুবাইয়াতের চরণে। রুবাইয়াতের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো- প্রথম, দ্বিতীয় এবং চতুর্থ ছত্রে থাকে অন্ত্যমিল আর তৃতীয় ছত্রে থাকে অন্ত্যমিলের ক্ষেত্রে অন্যান্য চরণের ব্যতিক্রম। রুবাইয়াতের সাথে চীনা চতুষ্পদী কবিতা, জাপানি হাইকু, মালয়ি পাণ্ডমের সাদৃশ্য পেয়েছেন অনেক পণ্ডিতজন। রুবাই ফারসি সাহিত্যকে শুধু সমৃদ্ধই করেনি, পৃথিবীতে সর্বাধিক জনপ্রিয়তা দিয়েছে। ফারসি সাহিত্যের কাব্যকে প্রধানত চারটি শ্রেণীতে বিভাজন করা হয়। যথা- ১. কাসিদা (রঙ্গ বা ব্যঙ্গ কাব্য), ২. গজল (প্রেমগীত), ৩. মসনবি (দীর্ঘ কাব্যগাথা), ৪. রুবাই বা রুবাইয়াৎ।
ওমর খৈয়ামের পুরো নাম গিয়াস উদ্দিন ইবনে আল ফাতাহ ওমর ইবনে ইব্রাহীম আল খৈয়াম।  তিনি কবি ছাড়াও জ্যোতির্বিদ, গণিতবিদ এবং দার্শনিক হিসেবে খ্যাতির শীর্ষে অবস্থান করেছেন নিজস্ব প্রতিভায়। তিনি রুবাইয়াৎ লিখেছেন নিতান্ত খেলার ছলে কিংবা আবেগী উচ্ছ্বাসে। সেলজুক বংশীয় সম্রাট মালিক শাহের তিনি ছিলেন রাজ জ্যোতিষ। তার প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন মালিক শাহের পিতার প্রধান উজির নিজাম উল মুলক। ওমর খৈয়ামের জন্ম ইরানের খোরাসানের নিশাপুর শহরে। সম্ভবত ১০২১-২২ কিংবা ১০৪৮ খ্রিষ্টাব্দে। ওমর খৈয়াম অর্থাৎ পদবি হচ্ছে খৈয়াম যার ব্যুৎপত্তি খৈয়াম যার শাব্দিক অর্থ ‘তাঁবু নির্মাতা’। কবি নিজেই নিজের পদবি নিয়ে উপহাস করতে মোটেই বিচলিত হননি। উপহাস করতে গিয়ে লিখেন-


‘জ্ঞানের তাঁবু সেলাই করে খৈয়াম গেল বুড়ো হয়ে
ছিঁড়ে গেছে সূত্র এবার দিন কাটে তার দুঃখ সয়ে
ভাগ্যকাঁচি কাটল তারে হয়েছে সে পণ্য আজি
বিক্রিওয়ালা হাঁকছে লহ একটি গানের বিনিময়ে।’


ওমর খৈয়াম মতান্তরে ওমর খাইয়াম আরো আটজন গণিতবিদের সহায়তায় একটি পঞ্জিকা প্রণয়ন করেন, যার নাম (সম্রাটের নামানুসারে) জালালি সন নামকরণ করা হয়। তিনি গণিতশাস্ত্র, দর্শনশাস্ত্রের ওপর বহু গ্রন্থের প্রণেতা। পরবর্তীতে ওমর খৈয়াম ক্যালেন্ডারও তৈরি করেন। জীবদ্দশায় ওমর খৈয়াম কবি হিসেবে তেমন একটা জনপ্রিয়তা না পেলেও দার্শনিক, জ্যোতির্বিদ এবং বিজ্ঞানী হিসেবে খ্যাতির শীর্ষে অবস্থান করেছেন। বিজ্ঞান, দর্শন, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত গ্রন্থগুলোর বেশির ভাগ আরবি ভাষায় তিনি রচনা করেছেন। সামান্য কিছু ছোট গ্রন্থ এবং ইবনে সিনার লেখার অনুবাদ কেবল ফারসি ভাষায় লিখেছেন।
অমর খৈয়ামকে বিভিন্ন সময় ইমাম-এ খোরাসান, আল্লামা-এ-জামান, ইজ্জাতুল হক ইত্যাদি নামে ডাকা হতো। তার সম্পর্কে এসব বর্ণনামূলক ঘটনা প্রথম লিখেছেন তার শিষ্য নিজাম আরুজি ‘চাহার মাকালা’ নামক গ্রন্থে।
ওমর খৈয়ামকে নিশাপুরে নিজ জন্মভূমির মাটিতে কবরস্থ করা হয়। কবর ফলকের ওপর তার একটি রুবাইয়াৎ লেখা রয়েছে, যার বাংলা অনুবাদটি এমন-


‘রে মন জামানা যখন তোমাকে দুঃখ দেবে
এবং প্রাণ পাখিও দেহ পিঞ্জর ছেড়ে যে কোনো মুহূর্তে পাখা মেলতে পারে
তখন এই সবুজের উপর দু’টি দিন স্বস্তিতে কাটাও
তোমার সমাধির উপর সবুজ ঘাস গজাবার পূর্বে।’


ওমর খৈয়াম প্রেমিক হিসেবেও ছিলেন অত্যন্ত বিখ্যাত। ইরানে একটি গল্প প্রচলিত আছে যে , 'বুখারায় পড়াশোনার সময় একই সঙ্গে দুই তরুণীর সঙ্গে প্রেম করতেন ওমর খৈয়াম । একজন রুবাই আরেকজন রুবাইয়াৎ। রুবাই ছিলেন গড়নের দিক থেকে মাঝারি আর রুবাইয়াৎ ছিলেন দীর্ঘাঙ্গী। দু’জনই জানতেন ওমর খৈয়াম দু’জনকে এক সঙ্গে ভালোবাসতেন। ওমর খৈয়ামের গজলে মুগ্ধ হয়ে রুবাই এবং রুবাইয়াৎ দু’জনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন একত্রে তারা বিয়ে করবে। পরবর্তীতে ওমর খৈয়াম দুর্বিপাকে তুরস্কে চলে এলে দু’জনের একজনকেও বিয়ে করা সম্ভব হয়নি। অন্য নারীকে তিনি বিয়ে করেন কিন্তু মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত রুবাই এবং রুবাইয়াৎকে নিয়ে লিখেছেন অমর গাথা। তাদের নামেই তিনি তার কবিতার নামকরন করেন ।


১৮৫৯ সালের দিকে ইংরেজ কবি এডওয়ার্ড ফিটজেরাল্ড ইরানের বিখ্যাত কবি ও দার্শনিক উমর খৈয়ামের   রুবাই সমূহ ইংরেজি অনুবাদ করার পর পাশ্চাত্য জগতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
তারই সূত্রে ইংরেজি থেকে বাংলায় কয়েকজন কবি সেগুলো অনুবাদ করলেও কিন্তু এসব অনুবাদে মূল অন্তমিল কাঠামো বজায় রাখা হয়নি। কারণ ভাব ও ভাষা উভয়ই ঠিক রাখা কঠিন। তাই প্রচলিত কবিতার ন্যায় প্রথম দ্বিতীয় লাইনে মিল এবং তৃতীয় ও চতুর্থ লাইনে আরেকটা মিল রাখা হয় (ককখখ)। তবে উল্লেখযোগ্যভাবে মূল ফারসী থেকে সরাসরি বাংলায় অনুবাদ করেছেন কাজী নজরুল ইসলাম, বহু ভাষাবিদ ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ।  
কাজী নজরুল ইসলাম মূল রুবাইয়ে ব্যবহৃত রচনাকৌশল ও অন্তমিলই (ককখক) ব্যবহার করেছেন। মূল ফারসী থেকে করা অনুবাদগুলোর মধ্যে কাজী নজরুল ইসলামের অনুবাদগুলোই সবচেয়ে ভালো বলে বাংলার গুণীরা স্বীকৃতি দিয়েছেন। সাহিত্যিক ও লেখক ডক্টর সৈয়দ মুজতবা আলী  বলেছেন , ‘কাজীর অনুবাদ সকল অনুবাদের কাজী।’
রুবাইয়্যাৎ আরবি বা ফারসী ভাষায় রচিত চতুষ্পদী কবিতা বা কবিতাসমূহ। চতুষ্পদী অর্থাৎ চার পঙক্তি বিশিষ্ট কবিতা। এটা বিশেষ ধরনের কবিতা। কিছু কিছু কবিতা আছে বিশেষ কিছু নিয়ম-কানুন মেনে সেগুলো লেখা হয়। যেমন- সনেট, লিমেরিক, এলিজি, ওড, রুবাই ইত্যাদি। রুবাইয়ের বহুবচন রুবাইয়্যাৎ (رباعيات) ) ১০৪৮ খৃস্টাব্দে তৎকালিন পারস্য অর্থাৎ বর্তমান ইরানের কবি  ওমর খৈয়াম  ও তার উত্তরসুরী শীরাজের কবি হাফিজ(১৩২৫-১৩৮৯ খ্রিস্টাব্দ) এর হাতে কবিতার এই বিশেষ ধরনটি চরম উৎকর্ষ লাভ করে। এটি ছড়া নয়। ছড়া হচ্ছে মূলত শিশুতোষ রচনা। রুবাই উচ্চমার্গের দার্শনিক রচনা। তাসাউফ ও দার্শনিক মতের সাথে মিল পাওয়া যায় রুবাইয়ের দর্শনের।
প্রধানত তাসাউফ দর্শন দ্বারা প্রভাবিত এসব রুবাই মাত্র চার লাইনে লেখা হয়েছে। রুবাইয়ে উল্লিখিত সাকি সুরা প্রতীকী বা রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এখানে সাকি বা প্রিয় হলেন মুর্শিদ আর সুরা বা শরাব হচ্ছে দিব্যজ্ঞান/পথের দিশা বা মুহব্বত-মা’রিফত। কিছু কিছু লিখাতে রোমান্টিকতাও রয়েছে।
রুবাইয়্যাৎ-এর কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এতে প্রথম, দ্বিতীয় ও চতুর্থ লাইনে একই অন্তমিল রাখা হয় তৃতীয় লাইনটি মুক্ত অর্থাৎ কোন অন্তমিল থাকে না, যেমন- ‘ককখক’। অনেকে অবশ্য ককখখ অন্ত্যমিল দিয়ে খৈয়াম ও হাফিজের রুবাই অনুবাদ করেছেন তবে তা সকলের কাছে গ্রহনযোগ্য হয়নি ।
আমার বিবেচনায় হালকা চটুল ব্যঙ্গ রসাত্মক বিষয়ে রুবাইয়্যাৎ-এর কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য বিহিন চারলাইনের কবিতাকে রুবাইয়াৎ না বলে চতুস্পদী বা চার্লাইনের কবিতা বলাই উত্তম ।
কবি কাজী নজরুল ইসলাম কতৃক অনুবাদকৃত সর্বাধিক আলোচিত রুবাইয়াৎ এ ওমর খৈয়াম ও রুবাইয়াৎ এ হাফিজ এর একটি করে উদাহরন তুলে ধরলাম -


রুবাইয়াৎ এ ওমর খৈয়াম


প্রভাত হলো। শারাব দিয়ে করব সতেজ হৃদয়-পুর,
যশোখ্যাতির ঠুনকো এ কাঁচ করব ভেঙে চাখনাচুর।
অনেক দিনের সাধ ও আশা এক নিমিষে করব ত্যাগ,
পরবো প্রিয়ার বেণী বাঁধন, ধরবো বেণুর বিধুর সুর।


রুবাইয়াৎ এ হাফিজ


‘যদিই কান্তা শিরাজ সজ্নী ফেরত দেয়
মোর চোরাই দিল্ ফের্,
সমরখন্দ আর বোখারায় দিই বদল তার
লাল গালের তিলেটার।