বিশুদ্ধ গণিত হলো যুক্তিগত ভাবনার কবিতা।গণিত ও কবিতা দুই বিপরীত মেরুর বসিন্দা নয় ।গণিতকে রসকষহীন অঙ্কশাস্ত্র বলে প্রায়শ: আমরাই ভুল বলি। গণিত ও কবিতা উভয়ের মিল আসলে  অনেক ক্ষেত্রেই।


শৈশবে অক্ষর ও সংখ্যা শিখতে আমরা  ছন্দের সাহায্য নিয়েছি। শিশুদের জন্য রচিত কবিতাগুলি গণিত মেনে লেখা হয়  যাতে তাদের মনে থাকে।'ছন্দে ও অন্ত্যমিলে লিখলে সে- কবিতা পাঠকের মনে থেকে যায় ।কাজেই পাঠকের স্মৃতিতে কবিতা সমুদ্রিত করার এটাই সেরা পদ্ধতি'। বেদের শ্লোকে,ঋষিদের ছান্দিক মন্ত্রোচ্চারণে,হোম- যজ্ঞের জ্যামিতিক ছকে তাই গণিতের ব্যবহার হয়েছে।


সত্য ও সুন্দরের সাধনা যদি কবিতার লক্ষ্য হয়ে থাকে,তবে গণিতেও তাই।গণিতের সৌন্দর্য নিয়ে বারট্রান্ড রাসেল বলেছেন,
'Mathematics,rightly viewed,possesses not only truth,but supreme beauty-


হাঙ্গেরীয় কবি পল এরডস্ বলেছেন,
'Why are numbers beautiful? It is like asking why is Bethoven's Nineth Symphony beautiful.If you do not see why,someone can not tell you.If they are not beautiful,nothing is! '


গণিত হচ্ছে যুক্তি ও শৃঙ্খলার সর্বোচ্চ রূপ।পক্ষান্তরে কবিতা প্রতিনিয়তই ভেঙ্গে দেয় প্রথাগত যুক্তির শৃঙ্খলা।কিন্তু যোগ,বিয়োগ,গুণ,ভাগই
কেবল অঙ্ক নয়।উচ্চতর গণিত প্রকৃতপক্ষে এক উচ্চতর ভাষা ব্যবস্থা- স্বতন্ত্র,স্বয়ংসম্পূর্ণ।এই যে আমরা জগতের অনেক কিছুই বুঝতে পারিনা,তার অন্যতম কারণ হল ভাষার সীমাবদ্ধতা ।তাদের অনেকটাই বোঝা যায় গণিতের ভাষা দিয়ে।কবিতাও কি তাই নয় ?


একটি কবিতা বিকশিত হতে হতে উৎকর্ষের দিকে যেতে যেতে ,এক পর্যায়ে পৌঁছে যায় বিশুদ্ধ গণিতের দশায়।তখন কবিতা হয়ে ওঠে গণিতের মতো মেটাফিজিক্যাল।জ্ঞান ও বোধ- অভিজ্ঞতায় একটি আদর্শ অথচ বিমূর্ত এলাকা গড়ে তুলতে চায় উভয়েই ।গণিত যেমন গবেষককে নতুন জ্ঞানের  আলো উপহার দিতে থাকে তার প্রতিটি হিসেবি পদক্ষেপে,কবিতাও তেমনি উপহার দেয় নতুন সৌন্দর্য,নতুন রস,চিত্তের জন্য নতুন আনন্দ যা,পাঠককে করে তোলে মুগ্ধ,বিস্মিত ও বিহ্বল।


গণিতের এই সৌন্দর্য নিয়ে কবিতা ইউরোপ, আমেরিকায় বহুকাল যাবৎ লেখা হচ্ছে।যেমন,কার্ল স্যান্ডবার্গের 'অ্যারিথম্যাটিক',
ওয়ালেস স্টিভেন্সের 'ল্যান্ডস্কেপ ফাইভ',লিন্ডসের 'ইউক্লিড' ইত্যাদি।
পোল্যান্ডের কবি উইসলাভা সিমবোরষ্কা  ১৯৬৬ সালে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন  কবিতায় গণিতের রহস্য একীভূত করার জন্য ।ওমর খৈয়াম ও এমিলি ডিকনসনও গণিতের সৌন্দর্যের বনেদে গড়ে তুলেছিলেন তাদের কাব্য।


বাংলাভাষায় কাব্যে গণিতের ভাবনা নিয়ে খুব বেশি কাজ হয়নি।একমাত্র ঊজ্জ্বল ব্যতিক্রম বিনয় মজুমদার,যিনি একাধারে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার,গণিতবেত্তা ও কবি।যিনি মনে করতেন 'কবিতা ও গণিত একই জিনিস' এবং সারাজীবন এই বোধ তাঁকে তাড়িত করে গেছে।ক্যালকুলাস,স্থানাঙ্ক জ্যামিতি,ঘনমূল প্রক্রিয়ার উল্লেখ মাঝে মাঝেই এসেছে তাঁর কবিতায় গণিত হিসেবে নয়,অবশ্যই কবিতা হিসেবেই।তাঁর একটি কবিতার নামই হল'আমি গণিত আবিষ্কর্তা'। কবিতার প্রথম পঙতি এ রকম :


'আমি গণিত আবিষ্কর্তা,আমার নিজের আবিষ্কৃত
ঘনমূল নির্ণয়ের পদ্ধতিটি বিদ্যালয়ে ঐচ্ছিক গণিতে
অন্তর্ভুক্ত আর পাঠ্য হয়ে গেছে যেটি
ক্রমে ক্রমে পৃথিবীর সব বিদ্যালয়ে
পাঠ্য হবে।'


আর একটি গাণিতিক কবিতা:
'X,Y ও Z


দুটো ভ্যারিয়েবল   X ও Y
X ও Y থেকে তৃতীয় একটি ভ্যারিয়েবল
বানাতে চাই আমরা।
তৃতীয় ভ্যারিয়েবল Z সহজেই বানানো যায়
ক্যালকুলাসের দ্বারা।
একমাত্র ঐ ক্যালকুলাসের জন্যই ময়ূরীর
সন্তান আরেকটি ময়ূরীর হয়--
ডিম থেকে ময়ূর হয়,তারপরে Z হয়.....'.


শেষে,সহজ গণিত মেশানো বিনয় মজুমদারের একটি কবিতা,'একটি গান':


X=0
এবং  Y=0
বা,X=0=Y
বা, X=Y


শূণ্য  0 থেকে প্রাণী X ও Y সৃষ্টি হলো
এভাবে বিশ্ব সৃষ্টি শুরু হয়েছিল।


এবার কবি মলয় রায়চৌধুরীর কবিতা 'অবন্তিকা ,তোর ওই মহেঞ্জোদরোর লিপি উদ্ধার'। কবিতাটা এরকম :


'কী গণিত কী গণিত মাথা ঝাঁঝাঁ করে তোকে দেখে
ঝুঁকে আছিস টেবিলের ওপরে আলফা গামা পাই ফাই
কস থিটা জেড মাইনাস এক্স ইনটু আর কিছু নাই
অনন্ত রয়েছে বটে ধূমকেতুর জলে তোর
আলোকময় মুখ
প্রতিবিম্ব ঠিকরে এসে ঝরে যাচ্ছে
রকেটের ফুলঝুরি জ্বলে।
কী জ্যামিতি কী জ্যামিতি ওরা ওরে
ইউক্লিডিনী কবি
নিঃশ্বাসের ভাপ দিয়ে লিখছিস
মঙ্গল থেকে অমঙ্গল....'


বাংলা কবিতা ডট কমেও একটি কবিতা পাচ্ছি 'গণিত শিল্পীর ভাবনা '।কবি সইদুল সরকার।প্রকাশনার তারিখ: ২৬।০৭।২০১৫


...তাই ভেবেছি --গণিত শিল্পী
হয়ে তোমার শরীরের
অ- উক্লিডীয় জ্যামিতিক অবয়ব
সৃষ্টি করে কনটিন্যুয়াম হাইপথেসিস
থিওরী দিয়ে সোজা প্রবেশ করবো
তোমার হৃদয়ে।
তারপর তোমার হৃদয়ের
অসীমতা নিয়ে আঁক কষতে
ক্যালকুলাসের লিমিট থিওরী
কষাকষি করতে করতে
এক ভালোবাসার মহাগণিত সৃষ্টি করবো...


সবশেষে অবশ্যই রবীন্দ্রনাথ।তাঁর' গণিতের রিলেটিভিটি প্রমাণের ভাবনায়' কবিতার কিছু অংশ:


গণিতের রিলেটিভিটি প্রমাণের ভাবনায়
দিনরাত একা ব'সে কাটালো সে পাবনায়,
নাম তার চুনিলাল,ডাক নাম ঝোড়কে।
.......
যোগ যদি করা যায় হিড়িম্বার চুক্তিতে
সে কি ২ হতে পারে গণিতের গুনতিতে।
যতই না কষে নাও মোচা আর মোড়কে
তার গুন ফল নিয়ে আঁক যাবে ভড়কে।



ঋণ:
বিনয় মজুমদার:কবিতার বোধিবৃক্ষ-
মলয় রায়চৌধুরি।