কবিতার এ পৃথিবীতে কতো বাক্যবাগীশ উঁচু মার্গে
বলায় হয় তবু গালিব ভিন্ন - কথার ঢঙে তুখোড়!


সন্দেহাতীতভাবে উপমহাদেশের সাহিত্যে আধুনিক চিন্তা ও শৈলীর প্রচলন উর্দূ ভাষার উৎকর্ষতার দ্বারাই সম্পন্ন হয়েছে। উর্দূ সাহিত্যিকগণের সকলেই ছিলেন আরবী ও ফার্সিতে সুপন্ডিত। তৎকালীন মুসলিম শাসকদের কাছে ফার্সির দাপ্তরিক গুরুত্বের পাশাপাশি জনসাধারণের সঙ্গে সহজ যোগাযোগের মাধ্যম (lingua franca)  হিসেবে উর্দূর সম্ভাবনা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়েছিলো। শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় ভারতীয় কবিগণ ফার্সি থেকে আহরিত শৈলী ও ভাবরসে উর্দূ কবিতার গতি সঞ্চারে মনোনিবেশ করেন। খসরু, ওলি, দর্দ, মীর, যওক্ব, মোমিন, বাহাদুর শাহ জাফর, গালিবের মতো দার্শনিক কবিদের নতুন নতুন সৃষ্টিতে মুখরিত ছিলো উপমহাদেশের সাহিত্য মানস। ভারতে মুসলিম শাসনের শেষ দিনগুলোতে চরম রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝেও উর্দূর উত্থান ছিলো সত্যি বিস্ময়কর। এ যেন একটি সাম্রাজ্যের বিদায়কালে তার পরবর্তীদের জন্য রেখে যাওয়া ‘রত্ন উত্তরাধিকার’। খসরু থেকে শুরু, আর গালিবের অসামান্য সৃষ্টি-সুখের উল্লাস দিয়ে পরিসমাপ্তি। কবিত্বে ও জনপ্রিয়তায় সেকালের মতো আজোবধি গালিব-ই শ্রেষ্ঠ। আমি নিজে তার দর্শন-বিশ্বাস ও যুক্তির সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত না হয়েও তাকেই বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কবিদের অন্যতম বলে মানি।


শুরুটা নিষ্কন্টক ছিলনা। দিল্লীর শেষ সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর কেন্দ্রিক 'লাল-কিলা'-র কবিতা আসরে তার শক্ত প্রতিপক্ষ ছিলেন স্বয়ং সম্রাটের ওস্তাদ ও সভাকবি শেখ মোহাম্মদ ইব্রাহীম যওক্ব। ১৮৪১-এ উর্দূ দীওয়ান এবং ১৮৪৫-এ ফার্সি দীওয়ান প্রকাশিত হওয়ার পর উর্দূ ও ফার্সি সাহিত্যে তার শ্রেষ্ঠত্ব সন্দেহাতীত ভাবে স্বীকৃত হয়ে যায়। ‘নাজমুদ্দৌলা’, ‘দবিরুল-মূলক’, ‘নিযামে-জঙ্গ’ খেতাবে ভূষিত করে, ১৮৫০ খৃস্টাব্দে, সম্রাট জাফর শাহী দরবারে একজন সম্মানিত অমাত্য হিসেবে গালিবকে বরণ করে নেন। ১৮৫৪ খৃস্টাব্দে যওক্বের ইন্তেকাল হলে গালিব তার স্থলাভিষিক্ত হন। ‘পারতাবিস্তান’ নামকরণে তৈমুর শাহী বংশের ইতিহাস রচনার দায়িত্ব অর্পিত হলে, গালিব ‘মেহের-ই-নীমরোয’ নামকরণে প্রথম খন্ডের কাজ দক্ষতার সঙ্গে সম্পাদন করেন।


উর্দূ-ভাষী বন্ধুদের উৎসাহে আমি গালিবের গযল অনুবাদে হাত দিয়েছিলাম। সব অনুবাদই শেষপর্যন্ত ভাবানুবাদ বা নতুন এক কবিতা। তবু বলবো -  আমার কাজে আঙ্গিক ও ভাবে মূলের কাছাকাছি থাকার সর্বান্তকরণ প্রচেষ্টা ছিল। বোদ্ধা পাঠক মূল সাহিত্যের আমেজ অনুভব করবেন - একথা ভেবে আমি গালিবের গযলগুলো গযলের আঙ্গিক -  মাতলা, মাকতা, কাফিয়া, রাদিফ, বেড় - মেনে অনুবাদ করেছি। কাজটি সহজ সাধ্য ছিলোনা। এমনিতেই গালিব হলেন অতি উচ্চাঙ্গের ভাব সম্বলিত দুরূহ শৈলীতে পারঙম ওস্তাদ-শায়ের। তার বাক-চাতুর্য অসামান্য।  তার গযলের লাইনগুলো প্রায়শ দ্ব্যর্থবোধক। এ কারণে উর্দূ গযল-সাহিত্যে তিনি ‘মুশকিল-পসন্দ’ (master of paradox) হিসেবে খ্যাত হলেও তার ‘দীওয়ান-ই-গালিব’ আজো পাঠকের কাছে সমান চিত্তহারী।


এক সময় এ অঞ্চলে অনেকেরই উর্দূ কবিতা পাঠ করার সক্ষমতা ছিলো।  তারপর টেপ-রেকর্ডারের যুগে হিন্দী ফিল্মী গান হিসেবে ঐ উর্দূ গান ও গযল শুনার প্রচলন ছিলো। আজ আবারো ইউটিউবে অধুনা ফিল্মী গান থেকে সেকালের ক্লাসিক গযল পর্যন্ত এক আধটু শুনার ঝোঁক তৈরী হয়েছে। আমি লক্ষ্য করেছি বাংলাদেশেও গালিব ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছেন। তবে ভাষাগত প্রতিবন্ধকতার কারণে উর্দূ গযলের রস আস্বাদন যেনতেন প্রকারে চলছে। অথচ সাহিত্য-রস-আস্বাদন একটি পরিশীলিত মানসিক ব্যাপার। এক সময় কাজী নজরুল ইসলাম গযল বা গযলের অনুরূপ কবিতা লিখে বাংলা কবিতার গতি সঞ্চারে সফল হয়েছিলেন। তারপর আর কেউ এগিয়ে আসেননি। অথচ বাংলা ভাষায় বিশুদ্ধ গযল রচনার অপার সম্ভাবনা রয়েছে। আমি সেই মানসিক অবস্থার সরলিকরণে বাংলা ও উর্দূর মেলবন্ধন প্রয়াসি। বিশিষ্ট কবিদের দক্ষ হাতে  বাংলা থেকে উর্দূ এবং উর্দূ থেকে বাংলা এমন অনুবাদ-কর্ম উদার-নৈতিক নিরীক্ষার ক্ষেত্রকে প্রশস্ত করবে বলে আশাবাদি।