কবিতাকে বলা যায় অল্প কথায় অর্থপূর্ণ ভাবের প্রকাশ। মনের সুপ্ত অনুভুতিকে ভাষার আশ্রয়ে ফুটিয়ে তোলার শিল্পকর্ম। শব্দের ফুল দিয়ে বিনিসুতোর মালা গাঁথাও বলতে পারি।শব্দ-ফুল ছড়িয়ে আছে অভিধানের পাতায়, নয়ত আমাদের চলার পথের কথ্য ভাষায়। কবি তা থেকেই যত্নে কুড়িয়ে নেন, পেড়ে নেন, চয়ন করেন সঠিক কিছু শব্দ-ফুল। বিচক্ষণ কবি পথের ধারে পড়ে থাকা অবহেলিত শব্দকেও বহু মূল্যবান করে তোলেন তার যুৎসই প্রয়োগ দ্বারা।


কবিতার কথা উঠলেই চলে আসে অনেক গুলি বিষয়-
ভাব, ভাষা, শব্দ, ছন্দ, মাত্রা, বাক্য, পর্ব, মিল-অমিল, গদ্য-পদ্য, উপমা, উৎপ্রেক্ষা অনুপ্রাস, অলংকার, ঐক্যতান, রস, চিত্রকল্প, শৈলী আরো কত কি।


এই সব বিষয় নিয়ে বিভিন্ন কবি লেখকের হাত দিয়ে বাংলা ভাষায় বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে বিভিন্ন গ্রন্থে। অনেক একাডেমিক বা তাত্ত্বিক প্রবন্ধ আছে।এমনকি এখন অনেক অনলাইন ব্লগেও ভাল ভাল লেখা চোখে পড়ে। সংগ্রহ করে পড়লেই জানা হয়ে যাবে।
কিন্তু সব কিছুকে ছাপিয়ে কবিতার আসল জায়গাটা কিন্তু এর কাব্যিকতায়।
ধরুন, কারো যদি যোগ-বিয়োগের ধারনাই না থাকে সে অনেক ভাল একটা ক্যালকুলেটর পেলেও হিসেব মেলাতে পারবে না, তখন দোষ দিবে ঐ ক্যালকুলেটরকেই।
আর যে জানে যোগ-বিয়োগের কায়দা কানুন সে ক্যালকুলেটর পেলে আরো দ্রুত আরো নির্ভুল ভাবে হিসেব করতে পারবে।
আমি বলতে চাইছি, তথ্য সংগ্রহ ও সেই তথ্য বা তত্ত্বকে হৃদয়ে ধারন করা বা আত্নস্থ করা এক কথা নয়। জ্ঞান এবং সৃজনশীলতা একই বিষয় নয়। এখানেই কবি-প্রতিভার বিষয়টা চলে আসে। কবি হওয়ার জন্যে ভাষার উপর পি এইচ ডি করার প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন জীবনকে উপলব্দি করার মত সুক্ষ্ণ একটা মন এবং তা প্রকাশের জন্যে একটা নিজস্ব সৃজনশীল ভাষা তৈরী্র ক্ষমতা। নিরক্ষর লালন যখন বলেন-


" আপনারে আপনি চিনে নে;
দিন-দোনের পর, যার নাম অধর - তারে চিনবো কেমনে?
আপনারে, আপনি চিনে নে .......
আপনারে চিনতাম যদি, মিলতো অটল চরণ-নিধি
মানুষের করণ হত সিদ্ধি, শুনি আগম পুরাণে।।
আপনারে, আপনি চিনে নে .......
কর্তারূপের নাই অম্বেষণ, আত্মার কি হয় নিরূপণ ?
আত্মাতত্ত্বে পায় সাধ্য ধন; সহজ সাধক জনে।।
আপনারে, আপনি চিনে নে .......
দিব্যজ্ঞানী যে জন হলো, নিজতত্ত্বে নিরঞ্জন পেলো
সিরাজ সাঁই কয় লালন রইলো, জন্ম-অন্ধ মন-গুনে।।
আপনারে, আপনি চিনে নে ......."


হাজার, লক্ষ জ্ঞানী, ডক্টরেট ধারীরাও বিস্ময়ে অবাক হয়ে যান।


( চলবে...)