কবিতার কথা লেখা শুরু করেছিলাম নিছকই কবিতাকে একটু বুঝবার জন্যে, এখন লিখতে গিয়ে দেখলাম অল্প কথায় কবিতার মত গভীর, ব্যপক ও নিগুঢ় রহস্যময়ীর পরিচয় দেয়া অত সহজ নয়। নিজের জানাটাও একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে।কবিতা বিষয়ক লেখা পড়তে গিয়ে দেখলাম এই আসরের বেশ কিছু গুণী কবি সেই প্রয়াস নিয়েছিলেন বেশ কিছু গুরুত্বপুর্ণ লেখায়। কবিতাকে আসলে নানা দিক থেকে নানা ভাবে বর্ণনা করা চলে। প্রায় প্রত্যেক কবির নিজস্ব দৃষ্টিকোন থেকে কবিতাকে দেখা যায়। আমি চাইছিলাম আরো একটু গভীরে ডুব দিতে। খুঁজতে খুঁজতে একটা মনের মত বই হাতে এলো। বইটির নাম কাব্যালোক। প্রথম প্রকাশ ১৯৪৭ ইং। রচয়িতার নাম ড. সুধীরকুমার দাশগুপ্ত।ভদ্রলোক স্কটিশ চার্চ কলেজ এবং কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন। বইটি সেই সময়ে কবি, কাব্য সমালোচক ও পণ্ডিত সমাজে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলো বলে জানতে পারলাম। যাই হোক, আজকের পর্বে আমি সেই বইয়ের কিছু চুম্বক অংশ উদ্ধৃত করতে চাই আমাদের আসরের সব কবি এবং প্রিয় পাঠকদের জন্যে। উদ্দেশ্য আর কিছুই নয়, কবি ও কবিতাকে আরো কিছু ভিন্ন দিক থেকে দেখার প্রয়াস।


“ কবিপ্রতিভা সৃষ্ট যে শব্দার্থের বলে পাঠকের অলৌকিক আনন্দের প্রকাশ হয়, তাহাই কাব্য।“


“ আনন্দময় বাক্যই কাব্য।“


“ কবি তাহার আশ্চর্য প্রতিভা-বলে বস্তু-রাশি সমর্পিত করিয়া বিধাতার সৃষ্ট দৃশ্যমান জগতের বাহিরে যেন এক বিচিত্র মায়ার জগৎ নির্মাণ করেন। কাব্য জগৎ তাই অলৌকিক, অপূর্ব; ইহা আমাদের নিকট সৎও নয়, অসৎও নয়, ইহা অনর্বচনীয়।“


“ রবীন্দ্রনাথ বলিয়াছেন,-
সাহিত্য ব্যক্তি বিশেষের নহে, তাহা রচয়িতার নহে, তাহা দৈববাণী।“


“ শ্রেষ্ঠ কবি কাব্য রচনা করেন প্রাণময় বা মনোময় শরীরের ঊর্ধে নিজ বিজ্ঞানময় ও আনন্দময় সত্তায় অধিষ্ঠিত হইয়া। সৃষ্টির নব নব উম্মেষ্পূর্ন সেই আনন্দলোক এক দিব্যলোক, সে লোকের বাণী দৈববাণী, সে লোকের ব্যাপার দৈব ব্যাপার। দেবতা বাহিরে নয়, রজস্তমোমুক্ত প্রতিভার অমল সত্তাই দৈবসত্তা, এখানে কবিসত্তা। কবির মানুষী সত্তা এবং কবি সত্তা এক হইয়াও ভিন্ন।“


“কবি সেই দিব্য ভূমি হইতে স্বাভাবিক ভূমিতে অবতরন করিলে তাঁহার চিম্ময় সত্তাও আবৃত হয় এবং তিনি হ’ন দোষগুণময় সুখ-দুঃখ সমাচ্ছন্ন মানুষমাত্র। তখন স্বরচিত কাব্যের নানা ব্যঞ্জনাময় সূক্ষ্ণ অর্থসমূহ দেখিয়া তিনি নিজেই পরম বিস্ময়ে অভিভূত হন।“


“কাব্য কবির কৃতি হইলেও এক হিসাবে তারা পাঠকেরও সৃষ্টি। সহৃদয় পাঠকচিত্তে প্রবেশ করিতে না পারিলে কাব্যের কাব্যত্ব কোথায়? নিরবধি কাল ও বিপুলা পৃথিবীর কথা স্মরণ করিয়া তাঁহাকে শুধু দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিতে হয় সুদূরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া। সূর্যের প্রকাশক যেমন চক্ষু, পাঠকচিত্তকেও তেমনি কাব্যের প্রকাশক বলিলে অনেক কথাই বলা হয় না। কবির রচিত শব্দার্থ পাঠকের বাসনা-লোকের বিচিত্র স্ফুরণ জন্মাইয়া ও রসসৌন্দর্যের সম্পাদনা দ্বারা কাব্যত্ব লাভ করে। কবির মানুষ-জন্ম তুচ্ছ, কবি এক অমর জন্ম- সার্থক জন্ম লাভ করেন পাঠকচিত্তে, তাঁহার দেশ ও জাতির মানস-লোকে।“


“ আমরা বিচরণ করি দুইটি জগতে, এক আমাদের অনুভূত অন্তর্জগৎ, অপর দৃশ্যমান এই বহির্জগৎ। আমার জ্ঞানে ও অনুভুতিতে এই উভয় জগৎ সত্তাবান, বিধৃত ও প্রকাশিত। এই আমি যেমন আমার এই দেহেন্দ্রিয়-বুদ্ধি-সত্তাময় অন্তর্জগতের কেন্দ্র, তেমনি রূপরসগন্ধাদিময় ও প্রাণময় বহির্জগতেরও কেন্দ্র।সেই আমির শুদ্ধ স্বরুপ হইতেছে সত্তা, সংবিৎ বা চিৎ এবং আনন্দ। তমোগুণের আবরণ ও রজোগুণের বিক্ষেপহেতু চিদানন্দময় আমির অবাধিত প্রকাশ হয় কদাচিৎ। মানবের যাবতীয় কর্ম ও জ্ঞান প্রচেষ্টা এবং অন্তর্বেদনা এই শুদ্ধ আমিকে সহজরূপে প্রকাশ ও উপলব্ধি করিবার জন্য।কাব্যপাঠ বা নাট্য-দর্শনের সার্থকতার সত্য পরিমাপ হইবে আমাদের সংবিৎ ও আনন্দের আবরণ ভাঙিয়া ফেলিয়া নিজ শুদ্ধ স্বরূপকে প্রকাশ ও আস্বাদন করিবার ক্ষমতায়”


( চলবে...)