কবিতা সুন্দরীর রূপের বর্ণনা দিয়ে শেষ করা যাবে না। আমার সামাণ্য পাঠ জগত থেকে উদ্ধৃতি দিতে গেলেও পাতার পর পাতা ভরিয়ে তোলা যাবে। তাই সেই দিকে আর না গিয়ে কবিতার আরো কিছু অত্যাবশ্যক ও আনুষঙ্গিক বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি দেয়া যাক।হয়ত আসরের নবীন কবিদের কিছুটা উপকারে আসতে পারে।


বলে নেয়া ভাল, এই আলোচনায় আমি আমার নিজস্ব ধারনা ভিত্তিক বক্তব্য দিতে চেষ্টা করবো। সরাসরি কোন রেফারেন্স বই থেকে তুলে আনা কথা এই গুলি নয়। বরং বিভিন্ন সময় আগে বা পরে যে সব কবিতা বিষয়ক বই-পুস্তক পড়ে আমার মনে কিঞ্চিৎ ধারনা হয়েছে তারই আলোকে লেখার চেষ্টা।স্বাভাবিক কারনেই কোন কোন ক্ষেত্রে আমার ভুল হতে পারে অথবা অন্য কারো সাথে দ্বিমত দেখা দিতে পারে। আশা করি বিজ্ঞ পাঠক ও কবিগন সহনশীল দৃষ্টিতে দেখবেন, এবং যৌক্তিক জায়গায় ভুল থাকলে তা তুলে ধরবেন।


Structure  যার বাংলা সহজ প্রতিশব্দ হচ্ছে কাঠামো। একে আবার গঠনশৈলীও বলা চলে।কবিতার কাঠামোটি আসলে অনুভুতি্র প্রকাশ ভঙ্গী নয়, অথবা ছন্দের শ্রুতিগ্রাহ্য কোন বিষয়ও নয়, বরং এটি অনেকটাই দৃষ্টিগ্রাহ্য প্রদর্শিত স্বরূপ। কবিতার গঠন সাধারনত পঙতির সংখ্যা ও বিন্যাস, বাক্য প্রনয়নের অবয়ব, শব্দ সাজানোর পরিসর পর্ব-উপ পর্ব বা আধা পর্বের ব্যবহার ইত্যাদি দ্বারা নিরূপিত হতে পারে। যেমন সনেট কবিতায় ১৪ মাত্রার বাক্য এবং ১৪ বাক্যের সুনির্দিষ্ট কাঠামোতে থেকেই ভাব প্রকাশ হয়ে থাকে। একই ভাবে পয়ার, মহা পয়ার, লিমেরিক, অবরোহী, আরোহী থেকে শুরু করে মুক্ত গদ্য কবিতারও আছে নির্দিষ্ট নিজ নিজ ফরম্যাট। ছন্দের সাথে কাঠামোর সরাসরি কোন সম্পর্ক নেই। একই কাঠামোর মধ্যে একই ভাবকে কবি ইচ্ছে করলে ভিন্ন ভিন্ন ছন্দে সাজাতে পারেন। আবার ছন্দের প্রয়োজনে কবিকে কখনো কখনো কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে ভিন্ন কাঠামোতে লিখতে হতে পারে। কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর “কবিতার ক্লাস” বইটি খুবই বিখ্যাত একটি বই বিশেষ করে শিক্ষানবিশ কবিদের জন্যে। সেখানে কবি ছন্দ বুঝাতে কিছু কিছু উদাহরণ টেনেছেন। আমি তা থেকেই একটা উদ্ধৃত করছি ছন্দ কিভাবে কাঠামো পরিবর্তন করে দিতে পারে তা বুঝানোর জন্যে।


অক্ষরবৃত্ত ছন্দে লেখা দুটি বাক্য-


“দ্যাখো ওই পূর্ণচন্দ্র শ্রাবন-আকাশে,
স্বর্ণের পাত্রটি যেন শূণ্য’ পরে ভাসে।“
দুই লাইনের পঙতিতে ৪+৪+৪+২ = ১৪ চৌ্দ্দ মাত্রার বাক্য এটি। এটাই এর কাঠামো বিন্যাস।
৪+৪+৪+২
৪+৪+৪+২


এখন এই ভাবটিকেই স্বরবৃত্ত ছন্দে প্রকাশ করা হলো এই ভাবে-


“দ্যাখো দ্যাখো আজকে যেন
শ্রাবণ পূর্ণিমায়
সোনার থালা আটকে গেছে
নীল আকাশের গায়।“


দেখা যাচ্ছে ছন্দের সাথে সাথে এখানে কবিতার কাঠামোটাও পালটে গেছে। দুই লাইনের পরিবর্তে হয়ে গেছে চার লাইনের কবিতা।
৪+৪
৪+১
৪+৪
৪+১
কাঠামো বিন্যাস হয়ে গেছে এই রকম।

আবার কিছু কিছু কাঠামো আছে যা শব্দাক্ষর বা বর্ণ দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত। সেখানে কাঠামো নিজেই একটা বর্ণ ভিত্তিক ছন্দ সৃষ্টি করে। এই কাঠামো অর্থ হচ্ছে ছবি আঁকার ক্যানভাসের মত। ছোট-বড়, গোল-চ্যাপ্টা, পিরামিড যা খুশি আকৃতি নিতে পারে কবিতার দেহ।শুধু কবি তার সচেতন সৃজনশীল প্রক্রিয়ার মধ্যে তার দেহরূপ সৃজন করবেন। কবি যখন ইচ্ছা করেন আমি কোন নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে লিখব না, সেটাও মুলত এক সচেতন মুক্ত কাঠামোর জন্ম দেয়।


( চলবে ...)