সম্প্রতি কবি খাতুনে জান্নাত এই আসরে 'ছন্দের আলোয় মনের মুক্তি'শীর্ষক আলোচনায় কবিতায় ছন্দের গুরুত্বের কথা বিস্তৃত বলেছেন।
আমরা যারা কবিতাকে ভালোবাসি,কবিতা পড়ি বা লিখি,তাদের কাছে ছন্দ ও অলঙ্কারের ভূমিকা সত্যিই অনঃস্বীকার্য।আমার মতো যারা ছন্দে লেখেন না বা লিখতে পছন্দ করেন না,তাদের জন্যেও ছন্দ জানাটা জরুরি।যদিও মনে করি,কবিতার ক্ষেত্রে রসোত্তীর্ণ হওয়াই শেষ কথা এবং কে কিভাবে লিখবেন তা কবির একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় তথাপি,মনে রাখা দরকার যে, ছন্দ জানলে তবেই ছন্দছাড়া সার্থক কবিতা লেখা সম্ভব।একটি বাড়ি সেই ভাঙ্গতে পারে যে বাড়ি তৈরি করতে জানে বা যার বাড়ি তৈরির জ্ঞান আছে। আমরা কেউ ছন্নছাড়া কবিতা লিখতে চাই না।তাই প্রাথমিক ধারনা দেবার মতো করে অথবা,মনে করিয়ে দেবার মত করে ছন্দ ও অলংকার নিয়ে এক নজরে আরো একবার।


#ছন্দ:


বলার অপেক্ষা রাখে না যে,একজন কবির সুক্ষ অনুভূতি বা আবেগই কবিকে কবিতা লিখতে প্রাণিত করে।জোয়ারের জলের সঙ্গে এই আবেগকে তুলনা করতে পারি।যখন জোয়ার আসে এবং তীরে আছড়ে পড়ে  তখন নদীতে জলের যে গতিবেগ তাকে দ্রুত গতি বা দ্রুতলয় বলতে পারি।জোয়ার যখন সম্পূর্ণ তখন জলের বেগ মধ্যমগতির বা মধ্যমলয়ের।আবার যখন  ভাঁটা এগিয়ে আসে, তখন জলের গতি স্তিমিত বা ধীরগতির।এই লয়ের বিভিন্নতা ছন্দকে মূলতঃ তিনভাগে ভাগ করেছে।যথা,স্বরবৃত্ত,মাত্রাবৃত্ত ও অক্ষরবৃত্ত।
১.স্বরবৃত্ত:


বৈশিষ্ট্য:
*দ্রুত লয়
*পর্বের আদিতে শ্বাসাঘাত
*পূর্ণপর্ব ৪ মাত্রার
*মুক্তাক্ষর ১ মাত্রা
  রুদ্ধাক্ষর ১ মাত্রা
উদাহরণ:
বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই
মাগো আমার শোলক বলা কাজলা দিদি কই


পর্ব বিশ্লেষন করলে পাই,
বাঁশ বাগানের/মাথার উপর/চাঁদ উঠেছে/ওই
মাগো আমার/শোলক বলা/কাজলা দিদি/ কই
এবার ছন্দ বিশ্লেষন করি,
প্রথম চরণ-
বাশ্ =১ বা=১ গা=১ নের্=১          ৪ মাত্রা
মা=১ থার্=১ উ=১ পর্=১            ৪ মাত্রা
চাঁদ্=১ উ=১ ঠে=১ ছে=১             ৪ মাত্রা
ওই=১                                    ১ মাত্রা
                    মোট=  ৪+৪+৪+১
দ্বিতীয় চরণ-
মা=১ গো=১ আ =১মার্=১             ৪ মাত্রা
শো =১ লক্ =১ বা =১ লা =১        ৪ মাত্রা
কাজ্ =১ লা =১  দি =১  দি =১       ৪ মাত্রা
কই =১                                    ১ মাত্রা
                     মোট = ৪+৪+৪+১
২.মাত্রাবৃত্ত:


বৈশিষ্ট্য:
*মধ্যম লয়
*ধ্বনি ঝঙ্কার
*পূর্ণপর্ব ৫,৬,৭ মাত্রার
*মুক্তাক্ষর ১ মাত্রা
  রুদ্ধাক্ষর  ২ মাত্রা
উদাহরণ:
দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার
লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে যাত্রীরা হুঁশিয়ার


পর্ব বিশ্লেষন-
দুর্গম গিরি/কান্তার মরু/ দুস্তর পারা/বার লঙ্ঘিতে হবে/ রাত্রি নিশীথে/যাত্রীরা হুঁশি/য়ার
ছন্দ বিশ্লেষন-
প্রথম চরণ-
দুর্=২ গম্=২ গি=১ রি=১               ৬ মাত্রা
কান্=২ তার্=২ ম=১ রু=১              ৬ মাত্রা
দুস্ =২ তর্ =২ পা = ১ রা =১          ৬ মাত্রা
বার্ =২                                       ২ মাত্রা
                      মোট=৬+৬+৬+২
দ্বিতীয় চরণ-
লঙ্=২ ঘি =১তে =১ হ =১ বে =১       ৬ মাত্রা
রাত্=২ রি=১ নি=১ শী=১ থে=১         ৬ মাত্রা
যাত্ =২ রী =১ রা =১ হুঁশ্=২             ৬ মাত্রা
( ই) য়ার্=১                                   ২ মাত্রা
                     মোট = ৬+৬+৬+২
৩.অক্ষরবৃত্ত:


বৈশিষ্ট্য:
*ধীর লয়
*চরণের আদ্যন্ত তান
*মুক্তাক্ষর ১ মাত্রা
   রুদ্ধাক্ষর ১ মাত্রা, কিন্তু তা শব্দের শেষে
   থাকলে ২ মাত্রা।


উদাহরণ:
মহাভারতের কথা অমৃত সমান।
কাশীরাম দাস কহে শুনে পূণ্যবান।।


পর্ব বিশ্লেষন-
মহাভারতের কথা/ অমৃত সমান
কাশীরাম দাস কহে /শুনে পুণ্যবান
ছন্দ বিশ্লেষন-
প্রথম চরণ-
ম=১ হা=১ ভা=১ র=১ তের্=২ ক=১ থা =১                                                             ৮ মাত্রা
অম্ =১ ঋ=১ ত=১ স=১ মান্ = ২    
৬ মাত্রা
                         মোট = ৮+৬
দ্বিতীয় চরণ-
কা =১ শী=১ রাম্ =২ দাস্ =২ ক=১ হে =১                                                           ৮ মাত্রা
শু =১ নে =১ পূন্ =১ ণ=১ বান্ =২    
৬ মাত্রা
                         মোট = ৮+৬
লক্ষা করতে হবে, পূন্ এবং বান্ দুটিই রুদ্ধাক্ষর।কিন্তু একটি শব্দের প্রথমে থাকায় ১ মাত্রা এবং অন্যটি শব্দের শেষে থাকায় ২ মাত্রার হয়েছে।


#অলঙ্কার:


এরপর আসি,অলঙ্কারে। অলঙ্কার যেমন নারীর সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে,কাব্যের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য তেমনি অলঙ্কার রয়েছে। অলঙ্কার প্রধানতঃ দুই প্রকার।যথা,শব্দালঙ্কার ও অর্থালঙ্কার।
১.শব্দালঙ্কার:


শব্দের ধ্বনিরূপকে আশ্রয় করে যে অলঙ্কার বা সৌন্দর্য সৃষ্টি হয় তাকে শব্দালঙ্কার বলে।শব্দালঙ্কার প্রধানত:চারটি।যথা,অনুপ্রাস,যমক,শ্লেষ,বক্রোক্তি।
অনুপ্রাস:


একই ধ্বনি বা ধ্বনিগুচ্ছ একাধিক বার ব্যবহৃত হয়ে যে অলঙ্কারের সৃষ্টি হয় তাকে অনুপ্রাস বলে।
উদাহরণ :
'নাম লেখে ওষুধের
এ দেশের পশুদের'
এটি অন্ত্যানুপ্রাস।কেননা ধের ও দের অন্ত্যমিল পাচ্ছি।
আবার,'কাক কালো,কোকিল কালো,কালো কণ্যার কেশ'
এটি বৃত্তানুপ্রাসের উদাহরণ।কেননা,কালো কথাটি বারবার আবৃত্ত হচ্ছে।
'এখনি অন্ধ বন্ধ করোনা পাখা'
এখানে অন্ধ ব্যঞ্জন ধ্বনিটি একইক্রমে মাত্র দুবার ব্যবহৃত হয়েছে।তাই এটি ছেকানুপ্রাসের উদাহরণ।
যমক :


একই শব্দ দুই বা ততোধিক বার ব্যবহৃত হয়ে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ প্রকাশ করলে তাকে যমক বলে।
উদাহরণ:
'ভারত ভারতখ্যাত আপনার গুণে'


'তোমার এ বিধি,বিধি,কে পারে বুঝিতে ?'


'বাঁদরে দেখেই তাদের রাগ চড়ে
পাজীরে করল কাহিল সাত চড়ে।'
শ্লেষ:


একটি শব্দ যখন একবারই ব্যবহৃত হয়ে একের বেশি অর্থ প্রকাশ করে তখন তাকে শ্লেষ অলঙ্কার বলে।
উদাহরণ:
' কে বলে ঈশ্বর গুপ্ত ব্যস্ত চরাচর
যাহার প্রভায় প্রভা পায় প্রভাকর'
এখানে ঈশ্বর গুপ্তের দুটি অর্থ বোঝাচ্ছে।
বক্রোক্তি:


বক্রোক্তির অর্থ বাঁকা কথা।বক্তা যখন কোন কথাকে এক অর্থে ব্যবহার করেন আর শ্রোতা ভিন্ন অর্থে গ্রহণ করেন তখন তাকে বক্রোক্তি বলে।
উদাহরণ:
'আপনার ভাগ্যে রাজানুগ্রহ আছে
-- তিন মাস জেল খেটেছি; আর কতদিন খাটব'
২.অর্থালঙ্কার:


অর্থের আশ্রয়ে শব্দে যে অলঙ্কারের সৃষ্টি হয় তাকে অর্থালঙ্কার বলে।অর্থালঙ্কারেরও অনেকগুলি ভাগ,উপভোগ রয়েছে।ধৈর্যচ্যূতি না ঘটিয়ে এখানে কেবলমাত্র উপমা,রূপক এবং উৎপ্রেক্ষা অলঙ্কারের উল্লেখ করব।
উপমা :


একই বাক্যে ভিন্ন জাতের দুটি বস্তুর মধ্যে রূপের সাদৃশ্য কল্পনা করা হলে তাকে উপমা বলে।
উদাহরণ-
'রোদের নরম রঙ শিশুর গালের মতো লাল'


'বলেছে সে-- এতদিন কোথায় ছিলেন
পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন '


'দুধের মতো,মধুর মতো,মদের মতো ফুলে
বেঁধে ছিলাম তোড়া'
রূপক :


উপমেয়ের সাথে উপমানের অভেদ কল্পনা করা হলে রূপক অলঙ্কারের সৃষ্টি হয়।
উদাহরণ-
'এমন মানব জমিন রইল পতিত
আবাদ করলে ফলত সোনা'


'শতাব্দী যায় গড়িয়ে
সময় সমুদ্রের সামান্য একটা ঢেউ '


'তুষারের মতো যায় ঝরে
সব কথা আবেগের উত্তুঙ্গ শিখরে'
উৎপ্রেক্ষা:


উপমেয়কে উপমান বলে সন্দেহ হলে
উৎপ্রেক্ষা অলঙ্কার সৃষ্টি হয়।
উদাহরণ-
'মনে লাগিয়েছে আঁখি
শ্রাবণ কাঁদে না আমি কাঁদি'।


প্রসঙ্গত: জানাই যে,আলোচনার পাতায় ইতিমধ্যে অনেকে ছন্দ ও অলঙ্কারের বিস্তারিত ও মূল্যবান আলোচনা দিয়েছেন। তাদের মধ্যে কবি সুদীপ্ত বিশ্বাস,কবি ড.সুজিত কুমার বিশ্বাস,কবি রহমান মুজিব,কবি যাদব চৌধুরী প্রভৃতি সুধী কবিদের লেখাগুলি মনে আসছে।আমার লেখাটি কারো ভালো লেগে থাকলে উপরোক্ত লেখাগুলি অবশ্যই পড়ে নিতে হবে।



ঋণ:
বাংলাপিডিয়া
ডিজিটাল স্টাডি